টাঙ্গাইল বয়নশিল্পের সংকট ও সম্ভাবনার অর্থনীতি
জিআই ও ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেলেও সংকটের মুখে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল বয়নশিল্প। তাঁতিদের স্বল্প আয় ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের অভাবে পেশা বদলের প্রবণতা বাড়ছে।
প্রকাশ: · ১ মিনিট পড়া

ঐতিহ্যবাহী বয়নশিল্প হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত টাঙ্গাইল শাড়ি সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মর্যাদাপূর্ণ জিআই বা ভৌগোলিক নির্দেশক এবং ইউনেস্কোর স্বীকৃতি। এই স্বীকৃতিগুলো টাঙ্গাইল শাড়ির ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে নতুন পরিচিতি দিলেও, এর সাথে জড়িত কারিগর ও তাঁতিদের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেনি। ফলে সম্ভাবনাময় এই খাতের অর্থনীতি বর্তমানে নানা ধরনের সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের বয়নশিল্পের অন্যতম প্রধান এই কেন্দ্রটির উৎপাদন এলাকার পরিধি বেশ বিস্তৃত। এর মূল উৎপাদক অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে টাঙ্গাইল সদরের পাশাপাশি দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল-চণ্ডী এলাকা এবং কালিহাতী অঞ্চল। এসব এলাকার প্রতিটি ঘরে একসময় তাঁতের খটখট শব্দে মুখরিত থাকত চারপাশ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই শিল্প টিকিয়ে রেখেছিলেন স্থানীয় তাঁতিরা।
তবে জিআই ও ইউনেস্কোর স্বীকৃতির প্রভাব এই অঞ্চলের তৃণমূলের তাঁতিদের জীবনযাত্রায় কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পরও এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষগুলোর অর্থনৈতিক দৈন্য কাটেনি। উল্টো বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে লড়াই করে টিকতে না পেরে অনেক তাঁতি এই পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য পেশার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।
এই অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় কারণ হলো কম পারিশ্রমিক। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে একটি তাঁতে সারাদিন নিদারুণ পরিশ্রম করে একজন তাঁতি বড়জোর ৫০০ টাকা আয় করতে পারেন। এই স্বল্প আয়ে বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে একটি পরিবারের ভরণপোষণ চালানো অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে।
আয়ের এই তারতম্য স্থানীয় যুবসমাজকে তাঁতশিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করছে। যেখানে তাঁতে সারা দিন কাজ করে মাত্র ৫০০ টাকা আয় হয়, সেখানে বর্তমানে খুব সহজেই ব্যাটারিচালিত রিকশা চালিয়ে দিনে তার দ্বিগুণেরও বেশি আয় করা সম্ভব। ফলে পেশাগত এই পার্থক্যের কারণে অনেকেই তাঁত ছেড়ে রিকশা চালনার মতো পেশা বেছে নিচ্ছেন।
এই সংকট উত্তরণে এবং ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল বয়নশিল্পের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এর মতো প্রতিষ্ঠানের নীতিগত সহায়তা ও কার্যকর পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যথায় উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বিশ্বখ্যাত এই হস্তশিল্পের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।








