ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর আমিষ বিরোধী মন্তব্যে বিতর্ক
পশ্চিমবঙ্গে দুর্গা পুজোয় আমিষ খাবার খাওয়া নিয়ে স্বঘোষিত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বর বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্য এই মন্তব্য থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন এবং নানা মহল থেকে এর প্রতিক্রিয়া এসেছে।
প্রকাশ: · ১ মিনিট পড়া

পশ্চিমবঙ্গে দুর্গা পুজো চলাকালীন প্যান্ডেলের কাছে আমিষ ভোজন নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন স্বঘোষিত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী। তিনি তার মন্তব্যে বলেন, "পশ্চিমবঙ্গে দুর্গা পুজোয় প্যান্ডেলের কাছে আমিষ ভোজন করা হয়। এটি ঘৃণ্য খাবার, আমি চাই পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এটিকে বহিষ্কার করুন।" এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৭ সেপ্টেম্বর এক প্রেস কনফারেন্সে বক্তব্য রাখেন বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্য থেকে দল ও নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখে শমীক ভট্টাচার্য প্রশ্ন তোলেন, "বাইরে থেকে কে কী বলল তাতে এত চিন্তা কিসের?" তিনি আরও যোগ করেন, "বাঙালি সাধারণতো নবমীর দিন পাঁঠার মাংস খায়, অষ্টমীতে লুচি খায়। সেটাই খাবে।"
ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর প্রচারের ধরণ নিয়ে শমীক ভট্টাচার্য বলেন, "তিনি তার কথা বলতেই পারেন। সারা বিশ্বে অনেকেই তো ভেজিটেরিয়ান হওয়ার পক্ষে প্রচার করেন, কেউ বলেন, ভিগান হয়ে যান। আপনিও বলতে পারেন- সবাই মটন খেতে চলুন।" এ ছাড়াও তিনি মন্তব্য করেন যে, "তার কথাকে বাঙালি গুরুত্ব দেবে কি না সেটা বাঙালির ব্যাপার।"
এই বিতর্কিত মন্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্যান্য প্রতিক্রিয়াও লক্ষ্য করা গেছে। মমতা ব্যানার্জী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন যে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ করে দেবে। অন্যদিকে এই প্রসঙ্গে নেলিন মণ্ডলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব তাদের মতামত প্রকাশ করেছেন।
বাঙালির ঐতিহ্য ও ধর্মীয় আচার নিয়ে মুখ খুলেছেন ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরা। স্বামী পরমাত্মনন্দজি মহারাজ এই বিষয়ে স্পষ্ট করে জানান, বাঙালির নিজস্ব ধর্মীয় একটি শৈলী রয়েছে যা শাস্ত্রসম্মত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, "শাস্ত্র অনুযায়ী দুর্গাপুজোয় এবং যে কোনো শক্তি আরাধনায় আমরা আমিষের ব্যবহার দেখি। আমাদের এখানে কোনো ঝঞ্ঝাট নেই, ঝামেলা নেই। নতুন করে হঠাৎ একটা আবহাওয়া তৈরি করা হচ্ছে যে, শক্তি পূজায় আমিষ ব্যবহার নিষেধ। শক্তি পুজোয় দেওয়া যাবে না।"
ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত দিক থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট। পশ্চিমবঙ্গের বহু ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পরিবার, যার মধ্যে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার, চোরবাগান চ্যাটার্জী পরিবার, পটুয়াখোলা ব্যানার্জী বাড়ি, দর্জিপাড়া মিত্র বাড়ি এবং মণ্ডল বাড়ি অন্তর্ভুক্ত, তাদের শত শত বছরের পুরনো রীতি অনুযায়ী দুর্গোৎসবে আমিষ খাবার বা বলিদান প্রথা পালন করে আসছে। এই প্রথা এবং রামকৃষ্ণ মিশন ও চৈতন্য দেবের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত সংস্কৃতিকে সামনে রেখে বিভিন্ন মহল থেকে এই মন্তব্যের প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
নরেন্দ্র মোদীসহ অন্যান্য সর্বভারতীয় নেতার প্রসঙ্গ এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অবস্থানও এই বিতর্কের আবহে আলোচিত হয়েছে। তবে সার্বقভাবে ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর এই মন্তব্য পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যাভ্যাস ও ধর্মীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সংঘাত তৈরি করায় তা জনমানসে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।








