পিতামাতার আর্থিক অসদাচরণ ও প্রতারণায় ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে পিতামাতার প্রতি সর্বোচ্চ সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হলেও তাদের অনৈতিক বা প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, সন্তানের সম্পদে অন্যায়ভাবে দেনা তৈরি করা সম্পূর্ণ হারাম।
প্রকাশ: · ১ মিনিট পড়া

ইসলাম ধর্মে পিতামাতার প্রতি সদাচরণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং পারিবারিক জীবনে মা-বাবার স্থান সবার ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে। ইসলামের বিধান অনুযায়ী মা-বাবার সেবা ও তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা প্রতিটি সন্তানের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, এক ব্যক্তি নবীজির কাছে এসে জানতে চেয়েছিলেন, 'আমার উত্তম সাহচর্য পাওয়ার সর্বাধিক হকদার কে?' উত্তরে নবীজি তিনবার মায়ের নাম নেওয়ার পর চতুর্থবার পিতার কথা উল্লেখ করেছিলেন। এর মাধ্যমে মা-বাবার মর্যাদাকে সর্বোচ্চাসনে আসীন করা হয়েছে।
তবে ইসলামের দৃষ্টিতে পিতামাতাকে নিষ্পাপ বা মাসুম ঘোষণা করা হয়নি। মানুষ হিসেবে ভুলত্রুটি বা অন্যায় করার প্রবণতা তাদেরও থাকতে পারে। সে কারণে মা-বাবার কোনো অনৈতিক, ভুল বা প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড অন্ধভাবে মেনে নেওয়ার কোনো নির্দেশ ইসলাম দেয়নি। পবিত্র শরিয়তের মূলনীতি হলো ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখা এবং অন্যায় প্রতিরোধ করা। ইসলামে নিজের ক্ষতি করা যেমন বৈধ নয়, অন্য কারো ক্ষতিসাধন করাও বৈধ নয়—নবীজির এই বাণীর আলোকেই পারিবারিক ও আর্থিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই নীতি প্রযোজ্য হয়।
ইসলামী ফিকহশাস্ত্রে মানুষের ভরণপোষণের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট অগ্রাধিকার কাঠামো বা পরিভাষা রয়েছে। এই বিধান অনুযায়ী, মানুষের ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রথমে নিজের এবং তার অপ্রাপ্তবয়স্ক পোষ্য সন্তানদের প্রয়োজন মেটানোর দায়িত্ব আসে। এরপরেই পিতা-মাতা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভরণপোষণের দায়িত্ব বর্তায়। এই কাঠামোর বাইরে গিয়ে মা-বাবার তরফ থেকে কোনো ধরনের আর্থিক অসদাচরণ বা বলপ্রয়োগ করা হলে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
ইসলামের চার প্রধান মাজহাবাদে ফকিহগণ এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট ফতোয়া দিয়েছেন। তাদের সর্বসম্মত মতে, পিতামাতার জন্য সন্তানের সম্পদে প্রতারণামূলক দেনা তৈরি করা সম্পূর্ণ হারাম। কোনো সন্তানকে বিপদে ফেলে বা তার অজান্তে দেনাগ্রস্ত করা ইসলামে নিষিদ্ধ। তবে এই বিধানের একটিমাত্র ব্যতিক্রম রয়েছে, আর তা হলো সন্তানের বাস্তব ও প্রকৃত অভাবের ক্ষেত্র। যদি পিতা-মাতা চরম ও বাস্তব অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন, তবে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়, যা সাধারণ প্রতারণা বা অসদাচরণের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
পিতামাতার আনুগত্যের একটি মৌলিক সীমারেখা ইসলামে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত রয়েছে। মহান ধর্ম ইসলামে সৃষ্টিকর্তার বিধানকে সবকিছুর ওপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। নবীজি একটি সুপরিচিত হাদিসে ইরশাদ করেছেন, 'স্রষ্টার অবাধ্যতায় কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই।' এই সর্বজনীন মূলনীতির ভিত্তিতেই ফকিহ ও ইসলামী আইনবিদগণ মতামত দিয়েছেন যে, পিতা-মাতা যদি শরিয়তবহির্ভূত কোনো কাজের আদেশ দেন কিংবা সন্তানের আর্থিক ক্ষতিসাধন বা প্রতারণার আশ্রয় নেন, তবে সেই অনৈতিক আদেশের আনুগত্য করা সন্তানের জন্য ওয়াজিব নয়।
ইসলামী আইন ও ফিকহশাস্ত্রে বহু প্রখ্যাত ইসলামী মনীষী ও পন্ডিত এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। ফকিহ ও মুহাদ্দিসগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইমাম নববী, ইবনে কুদামাহ, ইমাম আবিদিন এবং ইমাম সুয়ুতি। তাদের প্রণীত ফিকহি গ্রন্থাবলিতে পিতামাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের পাশাপাশি তাদের অন্যায় আর্থিক হস্তক্ষেপ বা প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড থেকে বেঁচে থাকার এবং তা প্রতিহত করার আইনি ও শরিয়তসম্মত উপায়গুলোর বিশদ বর্ণনা রয়েছে।
সারაკথ্য হলো, ইসলাম পরিবারে পিতা-মাতার অধিকার ও সম্মান যেমন নিশ্চিত করেছে, তেমনি কোনো ধরনের আর্থিক প্রতারণা বা অবিচারকে প্রশ্রয় দেয়নি। নবীজির বিভিন্ন বাণীর আলোকে এটা স্পষ্ট যে, পারস্পরিক অধিকার রক্ষা এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ ও পরিবার গঠিত হতে পারে, যেখানে পিতামাতার প্রতি ভক্তি থাকবে, কিন্তু অন্যায়ের কোনো স্থান থাকবে না।








