ইনানী জাতীয় উদ্যানে মিলল ২৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী
কক্সবাজারের ইনানী জাতীয় উদ্যানে পরিচালিত এক গবেষণায় মহাবিপন্ন মেঘলা চিতা ও উল্লুকসহ ২৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি ও স্থানীয় জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে।
প্রকাশ: · ১ মিনিট পড়া

কক্সবাজারের ইনানী জাতীয় উদ্যানে চালানো এক নতুন গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের সন্ধান পাওয়া গেছে। ২০১৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষিত এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলে মহাবিপন্ন মেঘলা চিতা (ক্লাউডেড লেপার্ড) ও উল্লুকসহ মোট ২৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী নথিভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)-এর মতো সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, এই উদ্যানে স্তন্যপায়ী প্রাণীর উপস্থিতি ও তাদের আবাসস্থলের উপযোগিতা নিয়ে সম্প্রতি একটি গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণাটিতে সার্বিক দিক তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরা।
গবেষণাটির বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক বিপুল কৃষ্ণ দাস জানান, তাদের গবেষণার মূল দুটি অংশ ছিল। এর একটি হলো ওই এলাকার স্তন্যপায়ী প্রাণীর বৈচিত্র্য কেমন তা দেখা, আর অন্যটি হলো ওই এলাকার বসবাস উপযোগিতা কেমন তা নির্ধারণ করা। তিনি বলেন, "আমাদের গবেষণার দুটি অংশ। একটি হলো এখানে স্তন্যপায়ী প্রাণীর বৈচিত্র্য কেমন, আরেকটি হলো ওই এলাকার বসবাস উপযোগিতা কেমন। কোন এলাকায় কোন প্রাণীর আধিক্য, সেই এলাকায় কী ধরনের গাছ আছে, সেখানকার এনভায়রমেন্ট কেমন - সব মিলিয়ে একটা সম্পর্ক খুঁজে বের করা।"
সাত হাজার ৮৫ হেক্টর আয়তনের ইনানী জাতীয় উদ্যানকে ১১টি জোনে ভাগ করে এই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। গবেষকরা এই কাজের জন্য ৩২টি স্থানে ক্যামেরা ট্র্যাপ ব্যবহার করেন। ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের পাশাপাশি লাইন ট্রানসেক্ট এবং পরোক্ষ চিহ্ন বা স্পটিং পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় এলাকার ৩০০ মানুষের সাথে কথা বলা হয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। মাঠপর্যায়ের এই অনুসন্ধানে বন্যপ্রাণীর পাশাপাশি উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের তথ্যও সংগ্রহ করা হয়, যার মধ্যে ইনানী জাতীয় উদ্যানে ৬৬ প্রজাতির গাছ শনাক্ত করা হয়েছে।
গবেষণার সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি হলো দুর্লভ ও বিপন্ন প্রজাতির উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এ বিষয়ে বিপুল কৃষ্ণ দাস বলেন, "ওখানে পাঁচটা আমার ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে ধরা পড়েছে, আর ১৩টা ইভেন্টস আছে। মানে পাগমার্ক বা তার স্টুল - এগুলো দিয়ে আমরা ১৩টি ইভেন্টে ক্লাউডেড লেপার্ড পেয়েছি।" ক্লাউডেড লেপার্ড বা মেঘলা চিতা ছাড়াও এই বনে উল্লুক এবং এশিয়ান হাতির মতো গুরুত্বপূর্ণ স্তন্যপায়ী প্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
তবে এই সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য বর্তমানে বিভিন্ন সংকটের মুখোমুখি রয়েছে। গবেষক বিপুল কৃষ্ণ দাস এই অঞ্চলের প্রধান চাপগুলোর কথা উল্লেখ করে জানান, "এই অঞ্চলজুড়ে বিপুল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং স্থানীয় জনসংখ্যা বৃদ্ধি কক্সবাজার এলাকার জীববৈচিত্র্যে বড়ো ধরনের চাপ তৈরি করেছে।" আইইউসিএন-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে ৩৯০টি বন্য প্রাণী বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে, যার মধ্যে ৫৬টি প্রজাতি মহাবিপন্ন, ১৮১টি বিপন্ন এবং ১৫৩টি প্রজাতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের এই সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মোহাম্মদ ফিরোজ জামান। তিনি বলেন, "আমাদের অনেক জায়গায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জনবল সংকট, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নাই। যেভাবে আসলে ব্যবস্থাপনা করা প্রয়োজন সেটা অনেক ক্ষেত্রেই হচ্ছে না।"
এই গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য ভবিষ্যতে বন্যপ্রাণী ও বন ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিপুল কৃষ্ণ দাস আরও বলেন, "এই গবেষণার মধ্য দিয়ে আমরা ম্যানেজমেন্টের কাছে এটিই প্রেসক্রিপশন করতে চাই যে, এই ধরনের গাছগুলো লাগাতে হবে। এই গাছগুলো এই ধরনের প্রাণীগুলো পছন্দ করে। এভাবে এর হ্যাবিট্যাট ডেভেলপ করলে পরবর্তীতে এর সংখ্যা বাড়বে।"








