ফরিদপুরে সিজারে পেটে গজ রেখে মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি
ফরিদপুরের সমরিতা জেনারেল হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের পর পেটে সার্জিক্যাল গজ রেখে সেলাই করার অভিযোগ উঠেছে। ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বুধবার মধ্যরাতে কনিকা মন্ডল মারা যান। এই ঘটনায় সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রকাশ: · আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬, রাত ৭:১২· ১ মিনিট পড়া

ফরিদপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের সময় রোগীর পেটের ভেতর সার্জিক্যাল গজ রেখে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর ফলে দীর্ঘ ৫১ দিন ধরে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগে গত বুধবার (১৯ আগস্ট) মধ্যরাতে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কনিকা মন্ডল নামের এক প্রসূতির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই চিকিৎসামহলে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ২৯ জুন প্রসূতি কনিকা মন্ডল ফরিদপুরের সমরিতা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তের তত্ত্বাবধানে তার সিজারিয়ান অপারেশন সম্পন্ন হয় এবং তিনি একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। বর্তমানে শিশুটির বয়স দেড় মাস। অপারেশনের পর থেকেই কনিকা পেটে তীব্র ব্যথা ও নানা শারীরিক জটিলতা অনুভব করতে শুরু করেন। কিন্তু প্রসূতির পরিবার ও রোগীর অবস্থা সামাল দিতে গিয়ে তাকে বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকের চরম অবহেলায় কনিকার পেটের ভেতরেই সার্জিক্যাল গজ রেখে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ৩ জুলাই তাকে আবার সমরিতা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তার দ্বিতীয় দফায় আরেকটি অপারেশন করা হয়। কিন্তু তাতেও অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় পরবর্তীতে তাকে ইবনে সিনা হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা দেওয়া হয়। দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যন্ত্রণার অবসান হয়নি কোনোভাবেই।
অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে কনিকা মন্ডলকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় গত বুধবার (১৯ আগস্ট) মধ্যরাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এই পুরো ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর রোগীর স্বামী অশান্ত মন্ডল মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং সঠিক বিচার ও সুচিকিৎসার দাবি জানিয়েছেন। মৃত কনিকা মন্ডলের রেখে যাওয়া দেড় মাস বয়সী কন্যাসন্তানটি এখন মাতুলালয়ে বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
এই ঘটনার একটি অডিও রেকর্ড ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই অডিওতে ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তকে বলতে শোনা যায়, 'ভুল মানুষেরই হয়... অনেক ঝামেলার ভেতর থেকে আমি ভুল করে ফেলেছি। আমি বার বার ক্ষমাপ্রার্থী আপনার কাছে।' চিকিৎসক নিজেই নিজের ভুল স্বীকার করায় বিষয়টি নিয়ে জনমনে আরও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন দাবি ও আলোচনা সামনে এসেছে।
রোগীর মৃত্যুর পর বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ফরিদপুর সিভিল সার্জন কার্যালয় নড়েচড়ে বসে। ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান এই পুরো ঘটনার সুনির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মো. মহশিন শরীফকে প্রধান করে বা সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গঠিত এই তদন্ত কমিটিকে আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের নিকট প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিজারিয়ান অপারেশনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় এমন মারাত্মক ভুল এবং এর ফলে প্রসূতির মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে পুরো জেলায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।








