হরমুজ প্রণালির অস্থিরতায় কাতারের এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত
হরমুজ প্রণালির চারপাশে চলমান অস্থিরতার কারণে কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ স্থগিত করেছে কাতার এনার্জি। এর ফলে বাংলাদেশে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে এবং স্পট মার্কেট থেকে উচ্চ মূল্যে এলএনজি কিনতে গিয়ে সরকারের বড় অংকের লোকসান হচ্ছে।
প্রকাশ: · ১ মিনিট পড়া

হরমুজ প্রণালির চারপাশে তৈরি হওয়া অস্থিরতার জেরে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে এলএনজি সরবরাহ স্থগিত করেছে কাতার এনার্জি। এই পরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, কাতার এনার্জির কাছ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো চিঠি পায়নি পেট্রোবাংলা। অতীতেও ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির অস্থিরতার কারণে কাতার অনিবার্য পরিস্থিতির কথা জানিয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রেখেছিল। পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) ও অপারেশনের চলতি দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী শোয়েব আহমেদ এই তথ্য জানিয়েছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আবারও এমন পরিস্থিতি হলে আপাতত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা ছাড়া তেমন কোনো বিকল্প নেই।
এই সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পেট্রোবাংলা ইতিমধ্যে একটি উদ্যোগ নিয়েছে। ঘাটতি পূরণের জন্য ৩০টি প্রতিষ্ঠানের কাছে চারটি এলএনজি কার্গোর জন্য দরপ্রস্তাব চেয়ে নোটিশ জারি করেছে পেট্রোবাংলা। বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে এলএনজির দাম বেশ চড়া রয়েছে। জানা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) সূচকে এলএনজির দাম রয়েছে প্রতি ইউনিট ২২ দশমিক ৯৫ থেকে ২৩ দশমিক ৫০ ডলারের মধ্যে। অথচ সম্প্রতি কাতার থেকে আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম চাওয়া হয়েছে ২৫ দশমিক ৯২ ডলার।
আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকারের আর্থিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের চাহিদা মেটাতে প্রতি মাসে ১০টি এলএনজি কার্গোর মধ্যে সাত থেকে আটটিই স্পট মার্কেট থেকে কিনতে হচ্ছে। স্পট মার্কেটে প্রতি কার্গোর জন্য ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। কিন্তু এই গ্যাস বিক্রি করে সরকার পায় প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার মতো। এতে প্রতি কার্গোতে লোকসানের পরিমাণ ৭০০ কোটি টাকার বেশি দাঁড়াচ্ছে। এর ফলে প্রতি মাসে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতেই সরকারের বাড়তি লোকসান হচ্ছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এমনকি আগস্ট মাসের এলএনজি আমদানির জন্য পেট্রোবাংলাকে ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে সরকারকে।
দেশে জ্বালানির এই মূল্য ও আমদানির জটিলতার পাশাপাশি সার্বিক সরবরাহ চিত্রেও বড় ঘাটতি রয়েছে। ২০২৪ সালে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ছিল প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সে সময় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৩২ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট। এই সরবরাহের মধ্যে দেশীয় গ্যাস থেকে পাওয়া গেছে ১৬১ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি বা আরএলএনজি পাওয়া গেছে ৭০ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে দৈনিক ৭০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হলেও, এই টার্মিনাল দুটির সম্মিলিত সক্ষমতা রয়েছে প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট।
গ্যাসের এই ঘাটতির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের শিল্প উৎপাদনে। গ্যাস সংকটের কারণে ভালুকা, ময়মনসিংহের মতো শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এর ফলে কারখানাগুলোর উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে কারখানা বন্ধ হওয়া এবং শিফট কমিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ভালুকায় ছোট-বড় দুই শতাধিক কারখানার মধ্যে ৯৯টিই গ্যাসনির্ভর। গ্যাস সংকটের কারণে এই অঞ্চলের প্রধান কারখানাগুলোর উৎপাদন গড়ে নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে বা ৫০ শতাংশে। এই পরিস্থিতিতে শিল্প পুলিশ ও কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং গ্যাস ও জ্বালানি বিভাগ পুরো বিষয়টি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।








