বিনিয়োগ স্থবিরতা: তারল্য থাকলেও আস্থার সংকটে অর্থনীতি
বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাস কেটে গেলেও দেশের বিনিয়োগ খাতে স্থবিরতা কাটেনি। ব্যাংকিং খাতে পর্যাপ্ত তারল্য ও ঋণের উচ্চ সুদের হারের কারণে থমকে আছে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও বৈদেশিক মূলধন প্রবাহ।
প্রকাশ: · আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬, রাত ৭:১২· ১ মিনিট পড়া

বাংলাদেশে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ছয় মাস বা ১৮০ দিন কেটে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ খাতের কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরে আসেনি। বরং বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশকে প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। অথচ এই বিপুল পরিমাণ অর্থ অলস পড়ে থাকলেও বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না। এর পেছনে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে দেশের বাজারে ব্যাংকঋণের সুদ বেড়ে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে।
বিনিয়োগের এই খরা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধির চিত্রে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। অথচ এর ঠিক এক বছর আগে অর্থাৎ জুলাইয়ে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ।
শিল্প খাতের মূলধনি যন্ত্রপাতি এবং কাঁচামাল আমদানির তথ্য থেকেও বিনিয়োগ স্থবিরতার এই চিত্র স্পষ্ট হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমে ১৮০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও কমেছে প্রায় ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যা নতুন শিল্প স্থাপন ও উৎপাদনের বর্তমান অবস্থাকে নির্দেশ করে।
এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদরা আস্থার সংকটের কথা বারবার উল্লেখ করছেন। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এই বিষয়ে স্পষ্ট মন্তব্য করে বলেছেন, 'টাকা থাকলেই বিনিয়োগ হয় না, বিনিয়োগের জন্য আস্থা দরকার।' তাঁর মতে, কেবল অর্থের প্রাপ্যতা থাকলেই ব্যবসায়ীরা ঝুঁকি নিতে চান না, তার জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার আস্থার পরিবেশ জরুরি।
বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে দেশে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ৭৯ কোটি ৬৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে নিট এফডিআই কমেছে ৪৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
বিশেষ করে নতুন বৈদেশিক মূলধন আসার হার আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৭ কোটি ৮২ লাখ ডলার। যেখানে গত বছরের একই সময়ে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২৬ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। হিসাব অনুযায়ী, নতুন বিদেশি মূলধন কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। তবে এই পতনের মাঝে কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা গেছে পুনর্বিনিয়োগকৃত আয়ে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় এসেছে ৩৪ কোটি ২৯ লাখ ডলার, যা এক বছর আগে ১৯ কোটি ১২ লাখ ডলার ছিল।
সামগ্রিক এই পরিস্থিতিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষক ও প্রতিষ্ঠানগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশ্বব্যাংক, সিপিডি এবং ফাহমিদা খাতুন ও মোস্তাফিজুর রহমানের মতো বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি উত্তরণে ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই।








