বিদেশি বিনিয়োগে আস্থা ফেরাতে দীর্ঘমেয়াদি নীতির পথে সরকার, বাজেটে বড় সংস্কার ও প্রণোদনা
বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগ বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা, পাঁচ বছরের করনীতি, ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বিভিন্ন শিল্পখাতে বিশেষ কর-সুবিধা ও প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বলছে, এসব উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করবে।
ঢাকাপ্রকাশ: · ৩ মিনিট পড়া

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং দেশীয় বিনিয়োগের গতি বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে একাধিক সংস্কারমূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, করব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনা এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করাই এবারের বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত’ শীর্ষক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার ঘানি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।
নীতির ধারাবাহিকতায় গুরুত্ব
আশিক চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ। তাই এবারের বাজেটের মাধ্যমে সরকার স্পষ্ট বার্তা দিতে চায় যে, দীর্ঘমেয়াদে একই ধরনের বিনিয়োগবান্ধব নীতি বজায় রাখা হবে।
তিনি বলেন, বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আসবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তবে ধারাবাহিকভাবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাবে।
প্রথমবার পাঁচ বছরের করনীতি
বিডার চেয়ারম্যান জানান, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পাঁচ বছরের করনীতি আগাম ঘোষণা করা হয়েছে। ব্যক্তিগত আয়কর থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পখাতের কর-সুবিধা পাঁচ থেকে ১০ বছরের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা আরও সহজে করতে পারবেন।
তিনি বলেন, এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এ জন্য প্রযুক্তিনির্ভর করব্যবস্থা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, স্থানীয় মূল্য সংযোজন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উদ্ভাবনকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
ব্যবসা শুরু হবে ১৪ দিনের মধ্যে
ব্যবসা সহজ করতে একাধিক সংস্কার আনা হয়েছে। এখন একক সেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে মাত্র ১৪ দিনের মধ্যে ব্যবসা শুরু করা যাবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনুমোদন না দিলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে।
এ ছাড়া বন্ড লাইসেন্সের মেয়াদ এক বছর থেকে বাড়িয়ে তিন বছর করা হয়েছে। মূল কারখানার ৬০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা উৎপাদন ইউনিটগুলোও বন্ড সুবিধার আওতায় আসবে।
রপ্তানি ও বিনিয়োগে নতুন সুবিধা
রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, হস্তশিল্প, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণসহ ১০টি নতুন শিল্পকে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে বন্ড লাইসেন্স ছাড়াই শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে শুল্কমুক্ত আমদানিকৃত কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পণ্যের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ৩০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্ত তুলে নেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ হচ্ছে অর্থ প্রত্যাবাসন
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মূলধন ও মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে। এখন লভ্যাংশ ৩০ দিনের মধ্যে বিদেশে পাঠানো যাবে এবং অনাবাসী টাকার হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তরের সময়সীমা কমিয়ে এক কর্মদিবসে আনা হয়েছে।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়াই বিদেশে অর্থ পাঠানোর সীমা বাড়ানো হয়েছে। ভ্যাট সংক্রান্ত আপিলেও অর্থ জমার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে।
সম্ভাবনাময় খাতে দীর্ঘমেয়াদি কর-সুবিধা
বাজেটে ভোক্তা ইলেকট্রনিকস, কম্পিউটার, জাহাজ নির্মাণ ও ব্যাটারি শিল্পের কর-সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বহাল রাখা হয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রাংশ উৎপাদনে এই সুবিধা ২০৩১ সাল পর্যন্ত এবং নিবন্ধিত স্টার্টআপ ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, ওষুধশিল্প ও রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিশেষ প্রণোদনার মধ্যে রয়েছে ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল, স্টার্টআপের জন্য শূন্য টার্নওভার কর, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট নির্মাতাদের কর-ছাড়, বৈদ্যুতিক যানবাহনের আমদানি শুল্ক কমানো এবং সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও ওষুধশিল্পের কাঁচামালে শুল্ক অব্যাহতি।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ
তবে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান স্বীকার করেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এখনো বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান বাধা। তিনি বলেন, সরকার এ সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই ভবিষ্যতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
