বাংলাদেশে তীব্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, দিনে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং
গ্যাস সংকট, এলএনজি আমদানিতে জটিলতা এবং বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিলের কারণে দেশজুড়ে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে দিনে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তেলচালিত কেন্দ্র থেকে চার হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
প্রকাশ: · ১ মিনিট পড়া

বাংলাদেশে গ্যাস সংকট, এলএনজি আমদানির নানা জটিলতা এবং বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে বিপুল পরিমাণ বকেয়া পাওনা না মেটানোর কারণে এক তীব্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। এই বহুমুখী সংকটের জেরে বর্তমানে দেশজুড়ে দিনে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত সচল রাখার নানা উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে নানা বাধার মুখে পড়ছে। প্রথম আলোর তথ্যানুযায়ী, দেশে গত ৯ বছর ধরে গ্যাসের উৎপাদন ধারাবাহিকভাব কমে চলেছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি আমদানি অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে এবং এর দামও বহুগুণ বেড়ে গেছে।
জ্বালানি ঘাটতির এই চিত্র আরও স্পষ্ট হয় পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পরিসংখ্যানে। দেশে বর্তমানে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা রয়েছে ৩৮০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু গত মঙ্গলবার মোট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ২৩৩ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে এলএনজি থেকে এসেছে ৭১ কোটি ঘনফুট। এলএনজি আমদানির করুণ চিত্র তুলে ধরে দেখা যায়, গত বছরের প্রথম ৮ মাসে ৭১টি এলএনজি কার্গো দেশে আনা হলেও এবার এসেছে মাত্র ৬৮টি। এমনকি গত জুলাই ও আগস্ট মাসে এসেছে মাত্র ১৫টি কার্গো, অথচ গত বছর একই সময়ে এসেছিল ২১টি। এই এলএনজি আমদানির পথ আরও সংকুচিত হয় গত ২১ জুলাই, যখন আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং দেশে গ্যাসের সংকট চরম আকার ধারণ করে।
গ্যাসের এই তীব্র সংকটের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে উৎপাদন করা যাচ্ছে মাত্র ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি থাকলেও জ্বালানির অভাবে এখন উৎপাদন করা হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম। শুধু গ্যাস নয়, দেশের অন্যান্য বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রও নানা সংকটে জর্জরিত। পায়রা, মাতারবাড়ি, বড়পুকুরিয়া এবং ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রে বিভিন্ন ত্রুটি বা কয়লা সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
দেশে বর্তমানে ৮টি কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে পায়রা ও মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ইউনিটের সক্ষমতা ৬১২ মেগাওয়াট। এছাড়া ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা দেড় হাজার মেগাওয়াট। তবে এত বড় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গত গতকাল কয়লা থেকে সব মিলিয়ে ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এর পাশাপাশি অর্থসংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের বকেয়া জমেছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। বকেয়া টাকা পরিশোধ না করায় জ্বালানি সরবরাহ ও উৎপাদনে অনীহা দেখা দিয়েছে।
এই সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে বলেন, তেলচালিত কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন বাড়াতে সরকার ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রকে নিয়মিত বিল দিয়ে তেল আমদানি করতে বলা হচ্ছে। তেল পেতেও একটু সমস্যা হচ্ছে। সবারই নজর এখন সিঙ্গাপুরের বাজারে।
তেলচালিত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপুল ক্ষমতা থাকার পরও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বর্তমানে শুধু তেলচালিত কেন্দ্র থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এই খাত সচল রাখার চেষ্টা চললেও বেসরকারি খատ এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর এই নির্ভরশীলতা দেশের পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে। সরকারের তরফ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে এবং নিয়মিত বিল পরিশোধের তাগিদ দিয়ে তেল আমদানির ওপর জোর দেওয়া হলেও সিঙ্গাপুরের বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বৈশ্বিক নানা অস্থিতিশীলতার কারণে সার্বিক সমাধান এখনো অধরা রয়ে গেছে।








