সূর্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্তারিত ছবি, সৌরঝড়ের রহস্য উন্মোচনে যুগান্তকারী সাফল্য বিজ্ঞানীদের
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌর দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠের সর্বোচ্চ রেজুলেশনের ছবি ও টাইম-ল্যাপস ভিডিও ধারণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। এই পর্যবেক্ষণে প্রথমবারের মতো সূর্যের পৃষ্ঠে অতি ক্ষুদ্র প্লাজমা ঘূর্ণি সরাসরি শনাক্ত হয়েছে, যা সৌরঝড়, চৌম্বকীয় শক্তির বিস্তার এবং সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত তাপের রহস্য ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঢাকাপ্রকাশ: · আপডেট: ৭ আগস্ট ২০২৬, সকাল ১০:৫১· ২ মিনিট পড়া

সূর্যকে আরও কাছ থেকে দেখার ক্ষেত্রে নতুন ইতিহাস গড়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌর দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠের এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেজুলেশনের ছবি ও টাইম-ল্যাপস ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। এই পর্যবেক্ষণে সূর্যের চৌম্বকীয় শক্তি ও সৌরঝড় সৃষ্টির পেছনের দীর্ঘদিনের এক গুরুত্বপূর্ণ রহস্যের নতুন ব্যাখ্যা মিলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের হাওয়াইয়ে অবস্থিত ড্যানিয়েল কে. ইনোয়ে সোলার টেলিস্কোপ ব্যবহার করে গবেষকরা এই পর্যবেক্ষণ পরিচালনা করেন। গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞান সাময়িকী Nature-এ প্রকাশিত হয়েছে।
প্রথমবার দেখা গেল সূর্যের ক্ষুদ্র প্লাজমা ঘূর্ণি
গবেষণায় সূর্যের উপরিভাগে অতি ক্ষুদ্র প্লাজমা ঘূর্ণির অস্তিত্ব প্রথমবারের মতো সরাসরি শনাক্ত করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ঘূর্ণিগুলো কেলভিন-হেলমহোল্টজ ইনস্ট্যাবিলিটি (Kelvin–Helmholtz Instability) নামে পরিচিত একটি পদার্থবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং ন্যাশনাল সোলার অবজারভেটরির অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাস্ট্রোনোমার ড. ডেভিড কুরিডজে জানান, সূর্যের ভিন্ন গতির দুটি প্লাজমা প্রবাহ পাশাপাশি অতিক্রম করার সময় সংঘর্ষে এই সর্পিল ঘূর্ণিগুলোর জন্ম হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষুদ্র এই ঘূর্ণিগুলো ক্ষুদ্র ইঞ্জিনের মতো কাজ করে। এগুলো বিশাল প্লাজমা প্রবাহকে ভেঙে শক্তিকে অণুবীক্ষণিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে তাপ হিসেবে মুক্ত হয়ে সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডলকে অত্যন্ত উত্তপ্ত করে তোলে।
সৌরঝড়ের উৎস বুঝতে নতুন দিগন্ত
বিজ্ঞানীরা আরও জানান, এই প্লাজমা ঘূর্ণিগুলো সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রকে পেঁচিয়ে ও বিকৃত করে, যার ফলেই পরবর্তীতে শক্তিশালী সোলার ফ্লেয়ার এবং করোনাল মাস ইজেকশন (CME)-এর মতো সৌর বিস্ফোরণের সৃষ্টি হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের অন্যতম বড় প্রশ্ন ছিল, সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠের তুলনায় এর বাইরের বায়ুমণ্ডল বা করোনা কেন কয়েক হাজার গুণ বেশি উত্তপ্ত। নতুন এই গবেষণা সেই রহস্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাখ্যা তুলে ধরেছে।
পৃথিবীর জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আবিষ্কার শুধু মহাকাশ বিজ্ঞানেই নয়, পৃথিবীর প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সূর্যের চৌম্বকীয় শক্তি মহাকাশে ছড়িয়ে পড়লে তা পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইট, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, জিপিএস, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষকরা মনে করছেন, সূর্যের অতি ক্ষুদ্র গতিবিধি সম্পর্কে নতুন এই তথ্য ভবিষ্যতে সৌরঝড়ের আগাম পূর্বাভাস আরও নির্ভুলভাবে দিতে সহায়তা করবে।
ইনোয়ে টেলিস্কোপের নতুন সক্ষমতা
১৩ ফুট ব্যাসের বিশাল আয়না এবং অত্যাধুনিক অপটিক্যাল প্রযুক্তিসম্পন্ন ড্যানিয়েল কে. ইনোয়ে সোলার টেলিস্কোপ সূর্যের বায়ুমণ্ডলের এমন সূক্ষ্ম পরিবর্তনও ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে, যা আগে কোনো দূরবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা সম্ভব হয়নি।
বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, বাস্তব পর্যবেক্ষণ ও উন্নত কম্পিউটার সিমুলেশনের সমন্বয়ে ভবিষ্যতে সূর্য, সৌরঝড় এবং মহাকাশ আবহাওয়ার পূর্বাভাস আরও নির্ভুল হবে। একই সঙ্গে মহাকাশ প্রযুক্তি ও পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায়ও এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
