বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ও ঋণসহ বহুমুখী সংকট
বাংলাদেশ বর্তমানে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণ এবং খেলাপি ঋণের মতো নানাবিধ অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০.৮ শতাংশে পৌঁছেছে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১১ শতাংশ করেছে।
প্রকাশ: · আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬, রাত ৭:১৩· ১ মিনিট পড়া

বাংলাদেশ বর্তমানে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণ, রপ্তানি ঘাটতি এবং খেলাপি ঋণের মতো একাধিক তীব্র সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় বিভিন্ন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), বিশ্বব্যাংক, ইপিবি, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বেশ জটিল আকার ধারণ করেছে।
অর্থনৈতিক সূচকগুলোর মধ্যে মূল্যস্ফীতির চাপ অত্যন্ত প্রকট আকার ধারণ করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৮.৪০ শতাংশ। পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটে ২০২৫ সালের অক্টোবরে, যখন খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৮ শতাংশে দাঁড়ায়। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, এই সময়ে চালের দাম ১৩ শতাংশ, ডালের দাম ১৬ শতাংশ, ভোজ্যতেলের দাম ১৮ শতাংশ এবং সবজির দাম ২২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর বিপরীতে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৭.২ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বা রেপো রেট বাড়িয়ে ১১ শতাংশ করেছে। তবে মুদ্রানীতি কড়াকড়ি করার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। মার্কিন ডলারের লাগামহীন দরবৃদ্ধির ফলে প্রতি ডলারের মূল্য ১২২ টাকার বেশি ছাড়িয়ে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে বাজার থেকে রিজার্ভ থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। এর ফলে দেশের গ্রস রিজার্ভ বর্তমানে ২৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
দেশের বৈদেশিক খাতের ওপরও বড় ধরনের ঋণের চাপ রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ৮২.৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার মধ্যে সরকারি ঋণ ৫৩.২ বিলিয়ন ডলার। এই বিপুল পরিমাণ ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বৈদেশিক খাতের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাতের অবস্থাও খুব একটা সুবিধার নয়। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে ১.৫৬ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১২.৬ শতাংশ।
রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে কিছু খাতের অবদান থাকলেও সার্বিকভাবে বাণিজ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৬.৮ বিলিয়ন ডলার এবং বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭.৪ বিলিয়ন ডলার। একক খাত হিসেবে তৈরি পোশাক খাত দেশের রপ্তানিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি হয়েছে ৩৮.২ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির ৮২ শতাংশ। তবে এই খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪.২ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য খাতের মধ্যে চামড়া রপ্তানি ১.২ বিলিয়ন ডলার, ওষুধ রপ্তানি ২৫০ মিলিয়ন ডলার, আইসিটি রপ্তানি ৫০০ মিলিয়ন ডলার এবং কৃষিপণ্যের রপ্তানি ৮০০ মিলিয়ন ডলার হয়েছে।
রপ্তানির বাইরে বৈদেশিক আয়ের বড় উৎস প্রবাসী আয়েও বড় সাফল্য এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশ রেকর্ড ৩৬.২ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স অর্জন করেছে। তবে বিনিয়োগ এবং রাজস্ব সংগ্রহের চিত্র এখনও বেশ দুর্বল। আলোচিত সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই এসেছে মাত্র ২.৫ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির মাত্র ০.৫ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২.৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল। একই সময়ে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত কম, মাত্র ৮.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের বড় দুর্বলতা প্রকাশ করে।








