একাত্তরের মার্চে টেলিভিশনের ভূমিকা নিয়ে মোস্তফা মনোয়ারের স্মৃতি
প্রবাসীর প্রথম আলোর আনন্দপত্র সাময়িকীতে প্রকাশিত মোস্তফা মনোয়ারের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে ১৯৭১ সালের মার্চে টেলিভিশনের ভূমিকা। সে সময় দেশপ্রেমমূলক অনুষ্ঠান প্রচার এবং পাকিস্তান দিবসের কর্মসূচি নস্যাতের নানা ঘটনার কথা তুলে ধরা হয়।
প্রকাশ: · আপডেট: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৬:০৩· ১ মিনিট পড়া

প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী ও সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ারের একটি স্মৃতিচারণা প্রকাশিত হয়েছিল ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর। প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজন আনন্দপত্রে ‘৭১–এর মার্চের টেলিভিশন’ শিরোনামে তাঁর এই স্মৃতিচারণাটি প্রকাশিত হয়। যেখানে ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ মাসে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও এর সঙ্গে যুক্ত কলাকুশলীদের ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং বিভিন্ন কার্যক্রমের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
স্মৃতিচারণায় মুস্তাফা মনোয়ার উল্লেখ করেছেন যে তিনি ১৯৬০ সালে আর্ট কলেজে যোগদান করেছিলেন এবং পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে টেলিভিশনে কাজ শুরু করেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের সেই দিনগুলোতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের নানা বাধা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও টেলিভিশন কেন্দ্রটি কীভাবে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছিল, তার জীবন্ত দলিল রয়েছে এই লেখায়।
সে সময় টেলিভিশনের পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন দেশপ্রেমমূলক অনুষ্ঠান প্রচার করা হতো, যা সাধারণ দর্শক তথা বাঙালি জাতিকে দারুণভাবে উদ্দীপ্ত করেছিল। তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে টেলিভিশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার পক্ষে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন।
এই স্মৃতিচারণার অন্যতম একটি রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে। ওই দিন টেলিভিশন ভবনে কর্মরত বাঙালি কর্মীরা অত্যন্ত কৌশলী এক পদক্ষেপ নেন। তারা অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে পুরনো দিনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান বারবার সম্প্রচার করতে থাকেন, যার ফলে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক দীর্ঘ হয় অনুষ্ঠানমালা।
এই দীর্ঘায়িত সম্প্রচারের মূল উদ্দেশ্য ছিল সময়ক্ষেপণ করা, যাতে ঘড়ির কাঁটা এবং সম্প্রচারের সময় পেরিয়ে মধ্যরাত গড়ায়। এভাবে ২৪ মার্চ তারিখ শুরু হয়ে যাওয়ার পরই কেবল তারা সেই দিনের সম্প্রচার শেষ করেন। পাকিস্তানি কতৃপক্ষের নির্ধারিত পাকিস্তান দিবসের আনুষ্ঠানিকতা ও পতাকা উত্তোলনের দিনটিকে নস্যাৎ করার ক্ষেত্রে এটি ছিল টেলিভিশন কর্মীদের একটি নীরব কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিরোধ।
তাত্ত্বিক ও পেশাগত কাজের পাশাপাশি সেই উত্তাল দিনগুলোতে মুস্তাফা মনোয়ারসহ আরও অনেক প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব ও কলাকুশলী সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন জামিল চৌধুরী, কলিম শরাফী, মনিরুল আলম, জামান আলী খান, বঙ্গবন্ধু, মাসুমা খাতুন, বেলাল বেগ, আবদুল্লাহ আল মামুন এবং মমিনুল হকের মতো বিশিষ্টজনেরা, যাদের সম্মিলিত অবদানে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে টেলিভিশন হয়ে উঠেছিল বাঙালির প্রতিরোধের অন্যতম মাধ্যম।
স্মৃতিচারণাটিতে তৎকালীন সামরিক বাহিনীর এক মেজর সম্পর্কেও একটি বিশেষ স্মৃতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেই মেজরের একটি মন্তব্য ছিল ‘কাম খতম নেই হোতা’, যা সে সময়ের পাকিস্তানি সামরিক জান্তার মরিয়া ও বিভ্রান্ত অবস্থাকেই ফুটিয়ে তোলে। সব মিলিয়ে, ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রথম আলোর আনন্দপত্রে প্রকাশিত এই লেখাটি ১৯৭১ সালের মার্চে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে টেলিভিশন মাধ্যম ও এর কর্মীদের সাহসী অবদানের এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিল।








