জলবায়ু পরিবর্তন ও শুল্কের কারণে বিশ্ববাজারে বাড়ছে কফি
জলবায়ু সংকট, ভূরাজনীতি ও নতুন শুল্কের জেরে বিশ্বজুড়ে কফির দাম বাড়ছে। এর ফলে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের বাজারে পানীয়ের দাম বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন ও সরবরাহে তৈরি হয়েছে তীব্র চাপ।
প্রকাশ: · আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬, রাত ৭:১২· ১ মিনিট পড়া

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নতুন বাণিজ্য শুল্কের কারণে বিশ্বজুড়ে কফি বাজার চরম চাপের মুখে পড়েছে। ২০২৬ সালে এসে বিশ্বের বিভিন্ন প্রধান বাজারে কফির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। ভিয়েতনাম ও ব্রাজিলের মতো শীর্ষ কফি উৎপাদনকারী দেশগুলোতে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে সাধারণ ভোক্তা থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত কফি ব্র্যান্ডগুলোর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
যুক্তরাজ্যের পশ্চিম লন্ডনের কিউ ব্রিজে অবস্থিত 'ডিয়ার কোকো' নামের কফি দোকানের উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, সেখানে বর্তমানে একটি আইসড লাত্তে কিনতে খরচ হচ্ছে ৪.৫০ পাউন্ড, ১০ আউন্সের একটি লাত্তের দাম ৪.১০ পাউন্ড এবং ৬ আউন্সের একটি ফ্ল্যাট হোয়াইটের দাম রাখা হচ্ছে ৩.৯০ পাউন্ড। এই পরিস্থিতি নিয়ে ডিয়ার কোকোর অ্যান্থনি ডাকওয়ার্থ বলেছেন, আমরা যতদূর সম্ভব ফ্ল্যাট হোয়াইটের দাম ৪ পাউন্ডের নিচে রাখতে অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তবে এটি ধরে রাখা দিন দিন অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে, কারণ সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি অংশের খরচই বৃদ্ধি পেয়েছে। ৪ পাউন্ডের এই মনস্তাত্ত্বিক সীমাটি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্ব রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিশ্ববাজারে কফি bean-এর দাম বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে চরম আবহাওয়া জনিত নানা ঘটনা। ভিয়েতনামে তীব্র খরা ও টাইফুন এবং ব্রাজিলে তুষারপাতের মতো ঘটনার কারণে অ্যারাবিকা ও রোবাস্টা—উভয় ধরনের কফি বীজের দামই ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন এগ্রিকালচারাল সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, কফি উৎপাদক দেশগুলোতে বৃষ্টিপাত ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এর আগে গত বছর অ্যারাবিকা কফির দাম প্রতি পাউন্ড ৪ ডলার বা ২.৯৭ পাউন্ড ছাড়িয়ে শীর্ষে পৌঁছানোর পর বর্তমানে তা ৩.০৮ ডলারে এসে স্থির হয়েছে। অন্যদিকে রোবাস্টা কফি বিনের দাম প্রতি পাউন্ড ২.৫৯ ডলার বা ১.৯২ পাউন্ডে পৌঁছানোর পর তা কমে প্রায় ১.৫৬ ডলারে নেমে আসে।
কফি বাজারের এই সংকটের পেছনে ভৌগোলিক ও জলবায়ু সংকটের পাশাপাশি বড় ভূমিকা রেখেছে নতুন বাণিজ্য শুল্ক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কফি উৎপাদনকারী দেশগুলোর ওপর বিভিন্ন শুল্ক আরোপ করেছে, যার ফলে বিশ্ব কফি বাজারে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে এবং বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে ভিয়েতনামের ওপর ৪৬ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ওপর ৩২ শতাংশ এবং ব্রাজিলের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপিত হয়েছে। এই কঠোর বাণিজ্যিক নীতির কারণে বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রেও এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে গত মার্চ পর্যন্ত সমাপ্ত বছরে রোস্টেড কফির দাম ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইনস্ট্যান্ট কফির দাম রেকর্ড প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। স্টারবাকসের প্রধান নির্বাহী ব্রায়ান নিকোল এবং লা মারজোক্কো কোম্পানির মতো বৈশ্বিক নামগুলোর পাশাপাশি কফি জগতের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব ও লাভাজার প্রধান গিউসেপ্পে লাভাজ্জা এই বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেছেন। গিউসেপ্পে লাভাজ্জা বলেছেন, টিকে থাকার মূল রহস্য হলো এমন একটি কোম্পানি গড়ে তোলা যা যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রস্তুত থাকে।
বিশ্ববাজারের বর্তমান এই চরম মূল্যবৃদ্ধি ও অস্থিরতা থেকে সহজে মুক্তির কোনো তাৎক্ষণিক উপায় দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। এই বিষয়ে গিউসেপ্পে লাভাজ্জা আরও যোগ করেন যে, দুর্ভাগ্যবশত আমাদের অন্তত কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে, কারণ বাজারে ভিন্ন ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে এমন দুটি বড় ফসল ব্রাজিল ও ভিয়েতনাম থেকে বাজারে আসার প্রয়োজন রয়েছে। ফলস্বরূপ, বিশ্বজুড়ে কফিপ্রেমী ও ব্যবসায়ীদের বর্তমান এই চড়া দামের সঙ্গেই আরও কিছুকাল পথ চলতে হবে।








