গ্রামীণ বাংলা থেকে হারাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঢেঁকি
যান্ত্রিকায়নের যুগে গ্রামীণ জনপদ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঢেঁকি। জীবিকা হারিয়ে প্রান্তিক নারীরা দৈনিক মজুরির কাজে যুক্ত হয়েছেন। বর্তমানে শহুরে সুপারশপে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ঢেঁকিছাঁটা চাল।
প্রকাশ: · আপডেট: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১০:৪৬· ১ মিনিট পড়া

বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে একসময় ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঢেঁকি প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই দেখা যেত। গ্রামীণ জীবনের দৈনন্দিন রান্নাবান্না ও উৎসব-পার্বণের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এই ঢেঁকি। মূলত চাল ভানা এবং বিভিন্ন ধরনের পিঠার আটা তৈরির কাজে ঢেঁকির ব্যবহার করা হতো। ঢেঁকি ব্যবহার করার সময় গ্রামীণ নারীদের কণ্ঠে নানা সুর ও গান শোনা যেত, যা লোকসংস্কৃতির একটি সুন্দর চিত্র ফুটিয়ে তুলত। লোকসংগীতের সেই চিরচেনা রূপটি আজও মানুষের মনে দোলা দেয়, যেখানে বলা হয়েছে, ঢেঁকি ‘ধান ভানি রে, ঢেঁকিতে পার দিয়া...’।
তবে সময়ের বিবর্তনে এবং আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গ্রামীণ সংস্কৃতি থেকে সেই ঢেঁকি আজ বিলুপ্তির পথে। কৃষিকাজে ও গৃহস্থালিতে যান্ত্রিকায়নের ফলে এই ঐতিহ্যবাহী উপকরণের ব্যবহার দিন দিন কমে গেছে। বিশেষ করে ইঞ্জিনচালিত চালকল বা রাইস মিল এবং আধুনিক মাড়াই যন্ত্রের ব্যাপক প্রসারের কারণে ঢেঁকির প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে এসেছে। ফলে গ্রামীণ Households বা পরিবারগুলো এখন আর কষ্ট করে ঢেঁকিতে ধান ভানে না, বরং খুব সহজেই মিলের সাহায্যে এই কাজ সম্পন্ন করে নিচ্ছে।
ঢেঁকির এই বিলুপ্তির পেছনে যান্ত্রিকায়ন প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। ঐতিহ্যবাহী এই পদ্ধতিটি হারিয়ে যাওয়ার ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অতীতে অনেক দরিদ্র ও প্রান্তিক নারী ঢেঁকিতে কাজ করে নিজেদের সংসার চালাতেন এবং জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু ঢেঁকির প্রচলন উঠে যাওয়ায় কাজের সেই সুযোগগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলস্বরূপ, অতীতে ঢেঁকির কাজের ওপর নির্ভরশীল এই প্রান্তিক ও দরিদ্র নারীরা বাধ্য হয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্য পেশায় চলে গেছেন এবং বর্তমানে দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিকের কাজ করছেন।
অন্যদিকে, সময়ের পালাবদলে ঢেঁকিছাঁটা চাল বা আটার রূপ বদলে গেছে। গ্রামীণ households থেকে হারিয়ে গেলেও এই চালের চাহিদা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জায়গায় স্থানান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে স্বাস্থ্যসচেতন এবং ডায়াবেটিক রোগীদের কথা মাথায় রেখে শহরের বিভিন্ন অভিজাত সুপারশপে ঢেঁকিছাঁটা চাল উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। শহুরে ক্রেতারা পুষ্টিগুণ ও ঐতিহ্যবাহী স্বাদের টানে চড়া দাম দিয়েই এই চাল কিনছেন।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতি থেকে ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঢেঁকির এই বিলুপ্তি যান্ত্রিকায়নের একটি বড় প্রভাব হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এককালের বহুল ব্যবহৃত এই উপকরণটি আজ সাধারণ মানুষের ঘর থেকে বিদায় নিলেও শহুরে বাজারে এটি একটি বিশেষ পণ্য হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এর মাধ্যমে ঢেঁকির ঐতিহাসিক ও পুষ্টিগত গুরুত্ব টিকে থাকলেও গ্রামীণ নারীর জীবনযাত্রায় এর বহুমুখী প্রভাব অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।








