সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে সালিশি আদালতের রায় ও বাংলাদেশের নদীর ভবিষ্যৎ
হেগের স্থায়ী সালিশি আদালতের সাম্প্রতিক এক রায়ে ভারতের সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই রায়ের পটভূমিতে সামনে এসেছে বাংলাদেশ-ভারত পানিসম্পদ কূটনীতি এবং ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির নবায়নের প্রসঙ্গ।
প্রকাশ: · ১ মিনিট পড়া

গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে নেদারল্যান্ডের হেগ শহরে অবস্থিত স্থায়ী সালিশি আদালত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায় প্রদান করেছে। এই রায়ে আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত রাখার ভারতীয় সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই বৈধ নয়। আন্তর্জাতিক পানি কূটনীতি এবং অভিন্ন নদীগুলোর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এই রায় ব্যাপক তাৎপর্য বহন করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের অভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনার ওপরও পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই আন্তর্জাতিক রায়ের সমসাময়িক সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের পানি কূটনীতি এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে চলে এসেছে। বিশেষ করে, দীর্ঘ ১২ বছর বিরতির পর ২০২২ সালের আগস্টে দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে উপাত্ত বিনিময়ের নদীর সংখ্যা ৭ থেকে বাড়িয়ে ১৫টিতে উন্নীত করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও দুই দেশের অভিন্ন নদীর প্রকৃত ব্যবস্থাপনা ও পানিবণ্টন নিয়ে নানা জটিলতা রয়ে গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মোট অভিন্ন নদীর সংখ্যা ৫৭টি। এর মধ্যে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার প্রবাহের প্রায় ৭০ শতাংশই আসে কেবল ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে। অন্যদিকে, ১৯৭৭ সালের ঐতিহাসিক চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানির ২৭ হাজার ৬০০ কিউসেকের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা রাখা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই পানির প্রবাহ হ্রাসের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
বিশেষ করে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ ও কৃষিতে এর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি দৃশ্যমান হচ্ছে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানির তোলার কারণে পানির স্তর অতীতে ৮-১০ ফুট গভীরে থাকলেও তা বর্তমানে নেমে ১০০ ফুটেরও নিচে নেমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের ওপর, যার ফলে এই প্রকল্পের ১ লাখ ২১ হাজার হেক্টর জমির সেচ কার্যক্রম চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
এমন একটি জটিল ও সংকটাপন্ন ভূ-রাজনৈতিক ও পরিবেশগত প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে ঘনিয়ে আসছে ১৯৯৬ সালের ঐতিহাসিক গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ। আগামী ডিসেম্বরেই এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। ফলে নতুন করে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন কিংবা নতুন রূপরেখা তৈরির বিষয়টি এখন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় এই বিষয়গুলো দীর্ঘকাল ধরে আলোচিত হয়ে আসছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পানি অধিকার রক্ষায় কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। তারই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ গত বছরের ২০ জুন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে ১৯৯২ সালের জাতিসংঘ পানি কনভেনশনে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, হেগের স্থায়ী সালিশি আদালতের এই রায় এবং ভারতের সিন্ধু পানি চুক্তি সংক্রান্ত আইনি অবস্থান বিশ্বজুড়ে অভিন্ন নদী অববাহিকার সুরক্ষায় নতুন বার্তা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আগামী ডিসেম্বরে মেয়াদোত্তীর্ণ হতে চলা গঙ্গা চুক্তি নবায়নের আগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক নিয়ম ও কনভেনশনের আলোকে জোরালো কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছে।








