শিক্ষকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত: ছাত্রীর সন্তান কোলে নিয়ে পরীক্ষা
সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুর রহমান রাহাদ ক্লাস টেস্টের সময় এক ছাত্রীর শিশুসন্তানকে কোলে রেখে তাকে নির্বিঘ্নে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। এই মানবিক ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
প্রকাশ: · আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬, রাত ৭:১৩· ১ মিনিট পড়া

সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার ক্ষেত্রে সম্প্রতি এক অনন্য ও মানবিক ঘটনার নজির স্থাপিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগের লেকচারার আব্দুর রহমান রাহাদ সম্প্রতি ক্লাস টেস্ট চলাকালীন এক ব্যতিক্রমী ভূমিকা পালন করেন। পরীক্ষার সময় এক ছাত্রীর শিশুসন্তানকে তিনি নিজের কোলে আগলে রাখেন, যাতে ওই ছাত্রী কোনো ধরনের দুশ্চিন্তা ছাড়াই স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের পরীক্ষা সম্পন্ন করতে পারেন। শিক্ষকের এই দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল আচরণ দেশের উচ্চশিক্ষাঙ্গনে এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
বাস্তবমুখী এই ঘটনায় শিক্ষক আব্দুর রহমান রাহাদের ভূমিকা কেবল শ্রেণিকক্ষের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা মাতৃত্ব এবং শিক্ষার অধিকারের এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করেছে। একজন নারী শিক্ষার্থীকে সমাজে নিজের স্থান করে নিতে এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে যে বহুমুখী লড়াই করতে হয়, সে বিষয়টি অত্যন্ত গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন এই শিক্ষক। সন্তানকে সামলে পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ওই ছাত্রীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করেন।
ঘটনাটি নিয়ে শিক্ষক আব্দুর রহমান রাহাদ তার অনুভূতির কথা প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, 'মাতৃত্ব কোনো বাধা নয়, বরং এটি জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। সন্তানদের সঙ্গে নিয়েই নিজের মেধার প্রমাণ দিয়ে আপনি সফলভাবে এগিয়ে যাবেন।' তাঁর এই সুদৃঢ় বক্তব্য নারী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও মাতৃত্বের লড়াইয়ে নতুন এক মানসিক প্রেরণা জোগাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষক রাহাদ আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, 'আমাদের কালচারে একটা মেয়েকে সফল হতে কতটা স্ট্রাগলের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সমাজ, পরিবার, স্বামী, সংসার, সন্তান—সবকিছু সামলে নিয়ে তবেই কেবল নিজের এগিয়ে যাওয়া কিংবা একটু স্বপ্ন দেখার সময় বের করতে হয়। তার পরীক্ষাটা আমি চাইলেই পরের স্লটে নিতে পারতাম। তবে আমার মনে হয়েছে, যদি এমনটা করি, সেটা তাকে একটা ভুল বার্তা দেওয়া হবে। একই রেসে নেমে তার সহপাঠীরা যথাসময়ে পরীক্ষা দেবে আর সে তাদের চেয়ে পিছিয়ে পড়বে—কেবলই তার বাচ্চার জন্য। এমনটা ভাবা একদমই সমীচীন নয়।'
ছাত্রীর পরীক্ষা পেছানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে সহপাঠীদের সমান্তরালে রেখেই পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়াকে তিনি নিজের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেছেন। পরীক্ষার মতো একটি প্রতিযোগিতামূলক মুহূর্তে কোনো শিক্ষার্থী যেন কেবল সন্তান লালন-পালনের কারণে পিছিয়ে না পড়ে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রেখেছেন এই শিক্ষক। তার এই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ বজায় রাখার এক চমৎকার উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
নিজের এই উদ্যোগের বিষয়ে বিনীত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আব্দুর রহমান রাহাদ আরও বলেন, 'একজন শিক্ষক একজন অভিভাবকের মতোই। একজন মানুষ হিসেবে সেই দায়িত্বটুকুই পালন করেছি। এটি আমার কাছে খুবই সাধারণ একটি বিষয়। তবে এটি নিয়ে এত আলোচনা হবে, তা ভাবিনি।' তাঁর এই সাধারণ অথচ মহৎ কাজটি সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় তথা পুরো দেশের সীমানা পেরিয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছে।
সারაკাল ধরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যে চিরায়ত সুসম্পর্ক এবং শ্রদ্ধার আবহ চলে আসছে, এই ঘটনাটি তারই একটি আধুনিক ও বাস্তব রূপ। সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগের এই শিক্ষকের মানবিক পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, সঠিক মানসিকতা এবং একটু সহমর্মিতা থাকলে শিক্ষা ক্ষেত্রে যেকোনো প্রতিবন্ধকতা সহজেই জয় করা সম্ভব। এই ঘটনাটি দেশের শিক্ষক সমাজ ও শিক্ষার্থীদের জন্য একটি উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।








