বাহ্যিক অর্থনীতিতে স্বস্তি, অভ্যন্তরীণ বাজারে সংকট
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতে প্রবাসী আয় ও রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও ব্যবসা ব্যয় বৃদ্ধির চাপ অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বৈদেশিক খাতের সূচকগুলো চাঙ্গা রয়েছে।
প্রকাশ: · ১ মিনিট পড়া

বাংলাদেশর বৈদেশিক অর্থনৈতিক খাতে প্রবাসী আয় এবং পণ্য রপ্তানির মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোতে দৃশ্যমান প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। একই সঙ্গে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণও সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। তবে এই ইতিবাচক খবরের বিপরীতে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে তীব্র সংকট বিরাজ করছে। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং ব্যবসার খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে দেশীয় অর্থনীতি বেশ বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। এরপর আগস্ট মাসে এই প্রবৃদ্ধির ধারা আরও গতিশীল হয় এবং গত মাসে প্রবাসী আয়ে ২২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়। সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে প্রবাসী আয় এসেছিল ২৮৬ কোটি মার্কিন ডলার এবং পরবর্তী মাস আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৯৭ কোটি মার্কিন ডলারে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এই শক্তিশালী প্রবাহ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভিত্তিকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিচ্ছে।
প্রবাসী আয়ের পাশাপাশি পণ্য রপ্তানি খাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। গত জুলাই মাসে পণ্য রপ্তানি সামান্য কমে দশমিক ৯০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে এবং গত মাসে দেশের পণ্য রপ্তানি বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪৩ কোটি ডলারে। প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, গত মাসের এই পণ্য রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এই দুই প্রধান উৎসে গতি আসার ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
বিদেশি মুদ্রা আয়ের এই ইতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার। পরবর্তীতে গত ২৭ আগস্ট শেষে এই রিজার্ভ আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৩২ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, গত বছরের ২৭ আগস্ট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে।
রপ্তানি ও রিজার্ভের এই ঊর্ধ্বমুখী চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্প ও বাণিজ্য খাতে। শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে কারণ গত এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট চলছে। এই জ্বালানি সংকটের কারণে কলকারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির এই সংকটের প্রভাব পড়েছে সরকারের রাজস্ব আদায়েও। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়েছিল। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায় কম হয়েছিল সাড়ে ৮৭ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে গত অর্থবছরে জ্বালানি খাতের ওপরও বড় ধরনের চাপ ছিল, যার ফলে বাংলাদেশ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়নের জ্বালানি আমদানি করেছিল। এছাড়া দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি পাচ্ছে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ।
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের মতামত তুলে ধরেছে। এই বিষয়ে প্রথম আলো সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে সিপিডি, এফবিসিসিআই এবং আইএমএফ-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। এসব পর্যালোচনায় ফজলুল হক ও খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতো বিশেষজ্ঞরা দেশের অর্থনীতির বর্তমান অভ্যন্তরীণ সংকট এবং বৈদেশিক খাতের উন্নতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোকপাত করেছেন।








