দক্ষিণ কোরিয়া ও বিশ্বে গণতন্ত্র রক্ষায় ঐতিহাসিক প্রতিরোধ
বিশ্বজুড়ে স্বৈরাচার ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রকামী মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস নতুন মাত্রা পেয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ায় সামরিক আইন জারির ঘটনা এবং অতীতে ফিলিপাইন ও তাইওয়ানের আন্দোলন এর বড় উদাহরণ।
প্রকাশ: · আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬, রাত ৭:১৩· ১ মিনিট পড়া

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে স্বৈরাচার ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ও গণতন্ত্রকামী নেতাদের দীর্ঘ সংগ্রাম সবসময়ই ইতিহাস গড়েছে। এশিয়া ও ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন সময়ে সামরিক জুন্টা কিংবা একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনতা রাজপথে নেমে এসেছে। হান্না আরেন্ট, রেবেকা সলনিট, মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এবং ইলহাম তোহতির মতো চিন্তাবিদ ও আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন সময়ে স্বাধীনতা ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলেছেন। এছাড়া কিম দে-জুং, ভাকলাভ হাভেল, লেখ ভাওয়েন্সা এবং নেটিউইট চোতিফাতফাইসালের মতো ব্যক্তিত্বরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। ওই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওল দেশে হঠাৎ করেই সামরিক আইন জারি করেন। এই ঘোষণা কোরিয়ান রাজনীতিতে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করে এবং সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই সামরিক আইনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা শেষ পর্যন্ত দেশটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে বড় ভূমিকা পালন করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার এই ঘটনার বহু বছর আগে এশিয়ার আরেকটি দেশে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জিত হয়েছিল। ১৯৮৬ সালে ফিলিপাইনে সংঘটিত হয় বিখ্যাত ‘পিপল পাওয়ার’ বিপ্লব। এই গণআন্দোলনের মুখে ফিলিপাইনের দীর্ঘদিনের একনায়ক ফার্দিনান্দ মার্কোসের স্বৈরশাসনের পতন ঘটে। লাখ লাখ সাধারণ মানুষ ট্যাংক ও সেনাসদস্যদের সামনে বুক পেতে দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের যে নজির স্থাপন করেছিলেন, তা বিশ্বজুড়ে স্বৈরতানবিরোধী আন্দোলনের এক অন্যতম মাইলফলক হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে।
একইভাবে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও কমিউনিজম ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। চেকোস্লোভাকিয়ায় ভাকলাভ হাভেলের নেতৃত্বে এবং পোল্যান্ডে লেখ ভাওয়েন্সার নেতৃত্বে শ্রমিক ও বুদ্ধিজীবীরা একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে সফল হন। এই দেশগুলোর মানুষের আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে দীর্ঘমেয়াদী নিপীড়ন ও সেনাশাসন সত্ত্বেও মানুষের স্বাধীনতার স্পৃহা দমন করা যায় না।
এশিয়ার আরেক জনবহুল ভূখণ্ড তাইওয়ানেও দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৯৬ সালে তাইওয়ানে প্রথমবারের মতো সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনটি তাইওয়ানের দীর্ঘ রাজনৈতিক রূপান্তর এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় একটি যুগান্তকারী মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে, যা স্বৈরতান্ত্রিক শাসন থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের পথ সুগম করেছিল।
থাইল্যান্ডের রাজনীতিতেও সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজ ও নেটিউইট চোতিফাতফাইসালের মতো কর্মীরা বারবার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। স্যাম ইয়ান প্রেসের মতো স্বাধীন প্ল্যাটফর্মগুলো সেনাশাসন ও সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মতো একদলীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে ভিন্নমতাবলম্বী ও উইঘুর পণ্ডিত ইলহাম তোহতির মতো ব্যক্তিরা কারাবরণ করেও মানবাধিকারের পক্ষে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
পরিশেষে, ফিলিপাইনের ‘পিপল পাওয়ার’ বিপ্লব, তাইওয়ানের ১৯৯৬ সালের সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ২০২৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় সামরিক আইন জারির পরের প্রতিরোধ—সব ঘটনাই এটি প্রমাণ করে যে, স্বৈরাচারী ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রকামী মানুষের লড়াই সর্বদা অব্যাহত ছিল এবং থাকবে। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে জনগণের এই সাহসী প্রতিরোধই স্বৈরাচারকে হটিয়ে গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করেছে।








