এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের সংগ্রামী গল্প
অভাব আর হাজারো প্রতিকূলতা জয় করে ২০২৪ সালের এসএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীরা। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তাদের এই সংগ্রামের চিত্র।
প্রকাশ: · ১ মিনিট পড়া

২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে বেশ কয়েকজন মেধাবী শিক্ষার্থী। তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে চরম অর্থনৈতিক সংকট ও অভাবের সঙ্গে লড়াইয়ের এক দীর্ঘ ইতিহাস। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উঠে আসা এসব শিক্ষার্থীর সাফল্যের উল্লাসের পাশাপাশি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে উচ্চশিক্ষার খরচ চালানোর অনিশ্চয়তা।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ফারিহা আফরোজ। তাঁর বাবা মো. হাফিজুর রহমান মেয়ের সাফল্যে বলেন, এমন মেধাবী ছাত্রীর জন্য হৃদয়বান মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন বলে আশা করি। ফারিহা আফরোজ জানান, বাবার দিকে তাকালেই কষ্ট হয়। তাঁর স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়ার; কিন্তু অভাবের সংসারে এই স্বপ্ন কতটুকু বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে তিনি চিন্তিত।
ঢাকার কেরানীগঞ্জের জিনজিরা পীর মোহাম্মদ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন স্মৃতি দেবনাথ। তাঁর পরিবারকে মাসে পাঁচ হাজার টাকা ঘরভাড়া দিতে হয়। স্মৃতি দেবনাথ বলেন, শিক্ষকেরা ক্লাসে যা পড়াতেন, বাসায় এসে সেগুলোই ভালোভাবে রিভিশন দিতেন এবং মাঝেমধ্যে সহপাঠীদের গাইড ফটোকপি করে পড়েছেন। ফলাফল ভালো হওয়ায় আনন্দিত হলেও তিনি এখন ভাবছেন সামনে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবেন কি না। তাঁর মা শিল্পী দেবী বলেন, মেয়েকে আরও পড়াতে হবে; কিন্তু কলেজে ভর্তি, বই-খাতাসহ অন্যান্য খরচ চালানোর সামর্থ্য তাঁদের নেই।
নীলফামারীর ডোমার উপজেলার খাটুরিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন অনিক ইসলাম। তাঁর বাবা নজরুল ইসলাম ও মা শেফালি বেগম। শেফালি বেগম জানান, অনিক যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়, তখন তাঁর স্কুলের পোশাক বানিয়ে দেওয়ার পর প্যান্টের নিচের দিকে কাপড় বেশি রাখা হয়েছিল এবং বড় হওয়ার পর তা একটু একটু করে খুলে দেওয়া হয়, শার্টে সাদা কাপড় জোড়া দিয়ে বড় করা হয়। এভাবেই এক পোশাকে সে তার স্কুল জীবন শেষ করেছে। নজরুল ইসলাম বলেন, বড় ছেলে টিউশনি করে অনিকের খরচ চালায়, এখন অনিকের পড়ার খরচ কীভাবে চালাবেন তা নিয়ে তিনি চিন্তিত। নীলফামারী সরকারি কলেজের মো. সহিদুল ইসলাম জানান, ছেলেটা অনেক মেধাবী ও ভদ্র হওয়ায় তাঁরা তাকে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার উপজেলা সদর বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন সালমা খাতুন। তাঁর মা জেসমিন খাতুন ও বাবা মো. জেল হোসেন সরকার। সালমা খাতুন বলেন, মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে যেভাবেই হোক পড়ালেখা শেষ করে ভালো কিছু করতে হবে। মোছা. ফুলবাহার বেগম ও মোছা. গুলবাহার বেগম জানান, মেয়েটা পড়ালেখায় খুব ভালো হলেও ভালো একটা কলেজে ভর্তি করানো এবং খরচ জোগানো তাদের জন্য খুব কঠিন।
নোয়াখালীর হাতিয়ার রেহানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন তাসফিয়া আক্তার। তাঁকে অভিভাবক হিসেবে লালনপালন করেছেন মোহাম্মদ ইলিয়াস ও শেফালি বেগম। মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, বাবা-মা না থাকার কষ্ট হয়তো দূর করতে পারবেন না, তবে অভাবের মধ্যেও তাকে নিজের সন্তানের মতোই বড় করেছেন এবং সে জিপিএ-৫ পাওয়ায় তাদের সব কষ্ট সার্থক হয়েছে। তাসফিয়া আক্তার বলেন, ভবিষ্যতে তিনি শিক্ষক হতে চান, যাতে তাঁর মতো কষ্টে থাকা শিশুদের পাশে দাঁড়াতে পারেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষক জগদীশ চন্দ্র দাস জানান, ২০১৮ সাল থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ শুরু হয় এবং সেই থেকে তাসফিয়াই প্রথম জিপিএ-৫ পেয়েছে, যা অন্যদের অনুপ্রাণিত করবে।








