ইয়াসমিন হত্যার ৩১ বছর: নারী নির্যাতন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
১৯৯৫ সালের ২৩ আগস্ট দিনাজপুরে ইয়াসমিন হত্যার এক দশক পেরিয়ে আজ ৩১ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে তনু ও নুসরাতসহ বহু নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও আজও থামেনি নারীর প্রতি সহিংসতা।
প্রকাশ: · আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬, রাত ৭:১২· ১ মিনিট পড়া

আজ ২৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্মরণ করা হচ্ছে ১৯৯৫ সালের ২৩ আগস্ট দিবাগত রাতে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের ৩১ বছর পূর্তি। সুদূর অতীতে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আজও দেশের নারী সমাজের মনে গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে। ওই রাতে দিনাজপুরের দশমাইল এলাকায় ঘটে যাওয়া এই নৃশংসতার শিকার হয়েছিলেন মাত্র ১৪ বছরের কিশোরী ইয়াসমিন। তার ওপর চালিত নির্যাতন ও পরবর্তীতে সংঘটিত অপরাধ পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
মাত্র ১৪ বছরের কিশোরী ইয়াসমিনের এই হত্যাকাণ্ডের পর পরই দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। বিচার ও প্রতিবাদের সেই দাবկে সোচ্চার হয়েছিল সাধারণ মানুষ। ইয়াসমিন হত্যার প্রতিবাদে দিনাজপুরের সচেতন ও ক্ষুব্ধ জনতা রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। কিন্তু সেই ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনের সময়ও নেমে আসে আরেকটি ট্র্যাজেডি। আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে চালিত পুলিশি গুলিতে প্রাণ হারাতে বাধ্য হন সাতজন প্রতিবাদী মানুষ, যা ইতিহাসের পাতায় একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
দিনাজপুরের এই ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের নারীদের নিরাপত্তা এবং সহিংসতার চিত্রটি আজও বদলায়নি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নারীর ওপর নির্যাতন ও হত্যার লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেই চলেছে। এই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে কুমিল্লা সেনানিবাসে ঘটেছিল বহুল আলোচিত সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ড। তনুর মতো একজন তরুণী ও ছাত্রীর এমন আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যু দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল, যার সঠিক বিচার আজও দেশের মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত একটি দাবি।
নারী নির্যাতনের এই ভয়াল রূপ কেবল কুমিল্লা বা দিনাজুপুরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরবর্তী বছরগুলোতেও এর পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হয়নি। এর প্রমাণ মেলে ২০১৯ সালে ফেনীতে ঘটে যাওয়া আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনায়। ওই বছর ফেনীতে নুসরাত জাহান রাফিকে অত্যন্ত নির্মমভাবে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। গায়ে আগুন দিয়ে হত্যার এই পৈশাচিক ঘটনাটি পুরো পৃথিবীকে নাড়া দিয়েছিল এবং নারী সুরক্ষার প্রশ্নটিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছিল।
নুসরাত হত্যার বিভীষিকা কাটিয়ে ওঠার আগেই ২০২০ সালে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে ঘটেছিল নারীর ওপর অমানবিক নির্যাতনের আরেকটি ঘটনা। বেগমগঞ্জের সেই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এভাবে একের পর এক সহিংসতার ঘটনায় বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে নারীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা এবং বিচার প্রক্রিয়ার গতিপ্রকৃতি।
১৯৯৫ সালের ২৩ আগস্টের সেই কালরাত্রি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনাই দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতির দিকে ইঙ্গিত করে। ইয়াসমিন থেকে শুরু করে তনু, নুসরাত কিংবা বেগমগঞ্জের নারীদের ওপর নির্যাতন—সব ঘটনাই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের নারীরা আজও নিরাপদ নন। সমাজের প্রতিটি স্তরে নারী নির্যাতন ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলার তাগিদ অব্যাহত রয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো ইয়াসমিন বা তনুর পরিণতি যেন এমন নির্মম না হয়।








