অনলাইনে চলছে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য কেনাবেচা
বাংলাদেশে অনলাইনে টাকার বিনিময়ে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য কেনাবেচার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ডেটা ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।
প্রকাশ: · ১ মিনিট পড়া

বাংলাদেশে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে টাকার বিনিময়ে দেদারছে কেনাবেচা হচ্ছে। সম্প্রতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের এক অনুসন্ধানে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের সময়কালে পরিচালিত এই অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, সাধারণ মানুষের নানা সংবেদনশীল তথ্য ডিজিটাল মাধ্যমে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে এবং অপরাধ চক্র তা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছে।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে তিনজন নির্দিষ্ট বিক্রেতার কাছ থেকে সরাসরি টাকা লেনদেনের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), মোবাইল ফোনের লাইভ অবস্থান এবং কল রেকর্ড বা কল লিস্ট কেনার সত্যতা মিলেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ ধরনের গোপন তথ্য সংগ্রহ করা এখন অপরাধীদের জন্য অত্যন্ত সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর জন্য নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করা রয়েছে।
তথ্য ফাঁসের এই বাজারের মূল্যতালিকা অনুযায়ী, মাত্র ৫০ থেকে ২০০ টাকার বিনিময়ে এনআইডির 'সার্ভার কপি' সংগ্রহ করা সম্ভব। এ ছাড়া ২৫০ টাকায় মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে এনআইডি বের করা যায়। অন্যদিকে, কল রেকর্ডের ক্ষেত্রে ৯০০ টাকায় তিন মাসের এবং ১ হাজার ৮০০ টাকায় ছয় মাসের কল তালিকা বিক্রি করা হয়। এমনকি মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকায় যেকোনো ব্যক্তির 'লাইভ লোকেশন' বা বাস্তব সময়ের অবস্থান জেনে নেওয়া যায়। আর্থিক সেবার ক্ষেত্রে আরও বেশি দর হাঁকা হয়, যার মধ্যে ৭ হাজার টাকায় নগদের হিসাব এবং ৭ হাজার ৫০০ টাকায় বিকাশ-সংক্রান্ত তথ্য বিক্রির তথ্য রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, শুধু সাধারণ প্ল্যাটফর্মেই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপে এই অবৈধ ব্যবসা বিস্তৃত। ২০২৪ সালে ২১টি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, ৪৮টি টেলিগ্রাম চ্যানেল এবং ৭২০টি ফেসবুক গ্রুপ ও পেজ—সব মিলিয়ে মোট ৭৮৯টি অনলাইন ঠিকানায় নাগরিকদের তথ্য বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। এই চক্রগুলোর তৎপরতা ডিজিটাল নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন তুলেছে।
এর আগে ২০২৩ সালে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের একটি সরকারি ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা দুর্বলতার কারণে প্রায় ৫ কোটি নাগরিকের তথ্য উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল। এই বিশাল ডেটা ফাঁসের ঘটনা দেশের সাইবার নিরাপত্তার ইতিহাসে অন্যতম বড় ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। সরকারি এই ওয়েবসাইটের দুর্বলতা নাগরিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের নভেম্বরে আরও একটি বড় ঘটনা প্রকাশ পায়, যেখানে তিতাস গ্যাসের ফায়ারওয়ালের 'রুট অ্যাকসেস' সরাসরি ডার্ক ওয়েবে বিক্রির জন্য তোলার বিষয়টি সামনে আসে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সেবা সংস্থার এমন কারিগরি নিয়ন্ত্রণ ডার্ক ওয়েবে চলে যাওয়ার ঘটনা দেশের সাইবার কাঠামোর নাজুক অবস্থাকেই স্পষ্ট করে তোলে।
এ বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সুমন আহমেদ সাবির ও তানভীর হাসান জোহা এর আগে দেশের বিভিন্ন ডেটা সুরক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিশ্লেষণে অংশ নিয়েছেন। ক্রমবর্ধমান এই তথ্য ফাঁস এবং অনলাইন বাণিজ্যের লাগাম টেনে ধরতে অবিলম্বে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ ও সাইবার অবকাঠামোর আধুনিকায়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।








