১৬ মাসেও প্রতিবেদন দেয়নি রাবির সত্যানুসন্ধান কমিটি
রাজশাহীতে ২০০৯ সাল থেকে সংঘটিত দুর্নীতি এবং ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানকালে নির্যাতন-হয়রানির অভিযোগ অনুসন্ধানে গঠিত সত্যানুসন্ধান কমিটি ১৬ মাসেও প্রতিবেদন জমা দেয়নি। প্রশাসন পরিবর্তন ও নানা জটিলতার কারণে এই তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত ও শ্লথ হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।
প্রকাশ: · আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬, রাত ৭:১২· ১ মিনিট পড়া

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ২০০৯ সাল থেকে সংঘটিত দুর্নীতি-অনিয়ম এবং ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানকালে নির্যাতন-হয়রানির অভিযোগ অনুসন্ধানে গঠিত সত্যানুসন্ধান কমিটি দীর্ঘ ১৬ মাসেও তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। বিগত ২০২৫ সালের কাছাকাছি সময় পর্যন্ত চলমান এই দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১৫ এপ্রিল সিন্ডিকেটের ৫৩৮তম সভায় ১৬ সদস্যের এই সত্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
গঠনের পর কমিটি সাতটি ইস্যুতে অভিযোগ ও তথ্য সংগ্রহ করে এবং কাজের সুবিধার্থে পরবর্তীতে পাঁচটি উপকমিটি গঠন করে। এসব উপকমিটির মাধ্যমে বিপ্লববিরোধী অবস্থানসংক্রান্ত ১২টি, একাডেমিক অনিয়মের ৩২টি, হলসংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির চারটি, যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন ও হয়রানির ১২টি এবং আর্থিক অনিয়মের নয়টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে কাজ শুরু হয়। এছাড়া কমিটি বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছিল এবং এসব রিপোর্টে বেশ কিছু ভয়াবহ চিত্রও উঠে এসেছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
তবে দীর্ঘ ১৬ মাস পেরিয়ে গেলেও প্রতিবেদন জমা না দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কমিটি গঠনের সময় মনে হয়েছিল দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলোর একটি নিরপেক্ষ অনুসন্ধান হবে। কিন্তু, ১৬ মাসেও প্রতিবেদন জমা না হওয়া খুবই অস্বাভাবিক বিষয়। ২০০৯ সাল থেকে দীর্ঘ সময়ের দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ এবং জুলাই অভ্যুত্থানকালের নির্যাতন ও যৌন হয়রানির মতো গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোর প্রতিবেদন দ্রুত প্রকাশ করা জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে কার্যক্রমে বিলম্বের বিষয়ে উপ-কমিটির এক আহ্বায়ক ও সদস্য জানান, অভিযোগের বিষয়ে তো তিনি কিছু বলতে পারবেন না। কারণ তাদের পরীক্ষা কমিটির কাজ থাকে, অ্যাকাডেমিক কাজ থাকে, রেজাল্ট দেওয়ার কাজ থাকে। আরও বিভিন্ন জটিলতায় অনেক সময় ব্যয় হয়। এছাড়া, বিষয়টা নিয়ে পূর্বে মামলা হলে, লিগ্যাল সেলেরও বিষয় থাকে এবং সবমিলিয়ে দেরি হয়। অধ্যাপক জামিরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে জানান, কয়েকটি মিটিং ডাকা হলেও পরে আর কোনো কার্যক্রম হয়নি এবং প্রতিবেদনও দেওয়া হয়নি। তিনি মন্তব্য করেন যে, সাধারণত যারা আহ্বায়ক কমিটিতে থাকেন, তারা সভা ডাকলেই কার্যক্রম এগোয়। তবে ভিন্ন একটি মন্তব্যে তিনি বলেন, বিভিন্ন ধরনের ক্যালকুলেশন থাকে এবং এমন অভিযোগের সত্যতা আছে বলে তার মনে হয় না।
প্রশাসন পরিবর্তনের ফলে এই কার্যক্রমে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। অধ্যাপক মোহাম্মদ বেলাল হোসেন জানান, ওই কমিটি পরিবর্তন হয়ে গেছে এবং যখন নতুন প্রশাসন এসেছে তখন ওই কার্যক্রমটা স্থগিত হয়ে গিয়েছে। গত সিন্ডিকেটে নতুন করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং সেই কমিটিতে তাকে রাখা হলেও উপ-কমিটি হয়েছে কি না সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম জানান, তারা কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেভাবে আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, ফলে প্রতিবেদনটি অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় রয়েছে। তিনি মনে করেন, বর্তমান উপাচার্য এ বিষয়ে কীভাবে উদ্যোগ নেবেন সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং প্রশাসন উদ্যোগ নিলে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে রিপোর্ট প্রকাশ সম্ভব।
অন্যদিকে অধ্যাপক খন্দকার মো. মোজাফফর হোসেন জানান বিষয়টি আপাতত স্থগিত আছে এবং তাদের হয়তো দু-একটা মিটিং করে প্রশাসনের সাথে কথা বলে ফাইনাল করা লাগবে। নতুন প্রশাসনের সাথে কথা না বলায় তারা এখনও এ ব্যাপারে প্রসিড করতে পারছেন না। রাকসু’র মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ফ্যাসিবাদ আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে এবং জুলাই অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক নির্যাতন-হয়রানির ঘটনাগুলো তদন্ত কমিটির মাধ্যমে উঠে আসা জরুরি। সত্যানুসন্ধান কমিটির কার্যক্রম নিয়ে তারা হতাশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৬ মাস ধরে একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ঝুলে থাকা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয় এবং এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং সত্য না হলে তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি জানান তিনি।
কমিটির দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গও এ বিষয়ে নানা মন্তব্য করেছেন। অধ্যাপক আব্দুল আলিম জানান, যারা ১৬ মাস সময় নিয়েছে, সেই জবাব তাদের দিতে হবে কারণ তিনি সেখানে ছিলেন না। অপরদিকে অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম জানান, তারা কমিটি পুনর্গঠন করছেন কারণ কিছু কিছু কমিটিতে পূর্বের প্রশাসনের দুই উপ-উপাচার্য দায়িত্বে ছিলেন যারা এখন আর নাই। কমিটি পুনর্গঠন হয়ে গেলে সেগুলো আবার কাজ শুরু করবে এবং যথারীতি প্রতিবেদন প্রকাশও সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।








