নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন সম্পন্ন
নয়াদিল্লিতে গত ১২-১৩ সেপ্টেম্বর ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৪০ দফার নয়াদিল্লি ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই সম্মেলন শেষ হয়েছে।
প্রকাশ: · ১ মিনিট পড়া

নয়াদিল্লিতে গত ১২-১৩ সেপ্টেম্বর ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুই দিনব্যাপী চলা এই আন্তর্জাতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও কূটনৈতিক আলোচনার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। সম্মেলনে যোগ দেওয়া বিশ্বনেতারা বৈশ্বিক নানা অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের ওপর জোর দেন।
এই সম্মেলনটি ১৪০ দফার একটি গুরুত্বপূর্ণ 'নয়াদিল্লি ঘোষণা'র মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ মোট ১১টি সদস্য দেশ সর্বসম্মতভাবে এই ঘোষণাপত্র গ্রহণ করেছে। উল্লেখ্য, এর আগে চলতি বছরের মে মাসে নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা কোনো ধরনের যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়েছিল। তবে এবারের শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ঐকমত্যের মাধ্যমে একটি দীর্ঘ ও পূর্ণাঙ্গ ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়।
এবারের সম্মেলনে অংশ নেওয়া সদস্য দেশগুলোর পরিধি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইন্দোনেশিয়া বর্তমানে ব্রিকসে যুক্ত হয়েছে। এই সম্প্রসারিত জোটের উপস্থিতি বৈশ্বিক অঙ্গনে এর গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদি, ভ্লাদিমির পুতিন, শি জিনপিং এবং মাসুদ পেজেশকিয়ানের মতো শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া কেনেথ ওয়াল্টজ, জেমস ফিয়ারন, দিমিত্রি দলগিন, হেনরি কিসিঞ্জার, রবার্ট পুতনাম, সি রাজা মোহন ও টমাস শেলিংয়ের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
ব্রিকস জোটের অর্থনৈতিক শক্তির কথা বলতে গিয়ে জানা যায়, এই জোট বর্তমানে বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক প্রতিনিধিত্ব করে। পাশাপাশি, বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ২৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে এই উদীয়মান অর্থনৈতিক ব্লকটি। সম্মেলনে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা এনডিবি-র ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত হয়। আটলান্টিক কাউন্সিলের জিও-ইকোনমিকস সেন্টার, ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্ট ব্যাংক, শিকাগো পলিসি রিভিউ, আইএনজি, দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও আলজাজিরাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম এই সম্মেলন ও এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে।
সংস্থার আর্থিক কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে জানানো হয় যে, ২০২৫ সাল নাগাদ প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ১৪০টি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪৩ শতাংশ অর্থায়ন হয়েছে সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায়, যা ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই আর্থিক লেনদেন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্রিকস জোটের অভ্যন্তরীণ শক্তি ও পারস্পরিক আস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
সম্মেলনে ব্রিকসের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে বিভিন্ন মত উঠে আসে। এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট বিশ্লেষক সি রাজা মোহন একটি সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, "ব্রিকসকে একটি নমনীয় সহযোগিতার মঞ্চ হিসেবে রাখা, কঠোর ভূরাজনৈতিক ব্লক নয়।" তার এই বক্তব্যটি জোটের কার্যপদ্ধতি ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
সামগ্রিকভাবে, নয়াদিল্লির এই ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন ব্রিকস জোটকে আরও সুসংহত করেছে। সদস্য দেশগুলোর বর্ধিত অংশগ্রহণ, নিজস্ব মুদ্রায় অর্থায়নের ক্রমবর্ধমান হার এবং ১৪০ দফার সর্বসম্মত নয়াদিল্লি ঘোষণা প্রমাণ করে যে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে এই জোটের প্রভাব দিন দিন আরও সুদৃঢ় হচ্ছে। আগামী দিনে বৈশ্বিক দক্ষিণের (গ্লোবাল সাউথ) স্বার্থ রক্ষায় এই মঞ্চ আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।








