দেশে কমেছে সবুজ ও টেকসই অর্থায়ন, ঋণ আদায়ও নিম্নমুখী
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে দেশে সবুজ শিল্প ও টেকসই অর্থায়নে বিনিয়োগ এবং ঋণ আদায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ঋণ পুনঃতফসিলের পরিমাণ এবং তিন মাসের ব্যবধানে কমেছে টেকসই কৃষিখাতে অর্থায়ন।
প্রকাশ: · ১ মিনিট পড়া

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে সবুজ শিল্প ও টেকসই অর্থায়নে বিনিয়োগ এবং ঋণ আদায়ের চিত্র নিম্নমুখী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের অন্তত ২০ শতাংশ টেকসই খাতে এবং মোট মেয়াদি ঋণের অন্তত ৫ শতাংশ পরিবেশবান্ধব বা সবুজ প্রকল্পে বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক তথ্যে এই খাতের অর্থায়নে হ্রাসের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের মার্চ প্রান্তিক শেষে সবুজ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৭৬৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। অথচ চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে সবুজ শিল্পে বিনিয়োগ কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৯৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সবুজ শিল্পে বিনিয়োগ কমেছে ৩ হাজার ৫৬৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
পাশাপাশি টেকসই অর্থায়নেও বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৫ সালের মার্চ প্রান্তিক শেষে টেকসই অর্থায়নে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ ছিল ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮১৯ কোটি ৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে টেকসই অর্থায়নে বিনিয়োগ কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৭ কোটি ২ লাখ টাকা, যা আগের তুলনায় ৪৯ হাজার ৭৬২ কোটি ৩ লাখ টাকা কম। তবে এই পরিস্থিতিতে বিকেএমইএ এবং ফতুল্লা অ্যাপারেলসের ফজলুল শামীম এহসানের মতো সংশ্লিষ্টরা মনে করেন প্রকৃত পরিবেশবান্ধব প্রকল্প যাচাই জরুরি।
বিনিয়োগের পাশাপাশি সবুজ ও টেকসই অর্থায়ন থেকে ঋণ আদায়ের পরিমাণও হ্রাস পেয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকে সবুজ অর্থায়নে বিতরণ করা ঋণের মধ্যে আদায় হয়েছে ৫ হাজার ৩৮ কোটি ৯ লাখ টাকা, যেখানে ২০২৫ সালের একই সময়ে সবুজ অর্থায়নে আদায়ের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৬১৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ সবুজ অর্থায়ন থেকে ঋণ আদায় কমেছে ৫৭৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। একইভাবে ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকে টেকসই অর্থায়ন থেকে আদায় হয়েছে ৫২ হাজার ৩৭৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, অথচ আগের বছরের একই প্রান্তিকে আদায়ের পরিমাণ ছিল ৭৭ হাজার ৯৪৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এতে টেকসই অর্থায়ন থেকে ঋণ আদায় কমেছে ২৫ হাজার ৫০০ কোটি ৮১ লাখ টাকার বেশি বা ২৫,৫৬৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
বিনিয়োগ ও আদায় হ্রাসের পাশাপাশি এই খাতে ঋণ পুনঃতফসিলের প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকে সবুজ অর্থায়নে ৪১১ কোটি ৬৫ লাখ টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল মাত্র ৫৩ কোটি ৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ সবুজ অর্থায়নে পুনঃতফসিল করা ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৩৫৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে টেকসই অর্থায়নে তিন হাজার ৭২৪ কোটি ১২ লাখ টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৬৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এতে টেকসই অর্থায়নে পুনঃতফসিল করা ঋণ বেড়েছে এক হাজার ৬৬০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
সবুজ ও টেকসই খাতের পাশাপাশি কৃষিখাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিক শেষে টেকসই কৃষিখাতে অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। অথচ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিকে টেকসই কৃষিখাতে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে টেকসই কৃষিতে অর্থায়ন কমেছে ২ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা।
এই সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা নানা মতামত দিয়েছেন। চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট গবেষক হেলাল আহমেদ জনি বলেন, টেকসই অর্থায়ন বাড়া অবশ্যই ইতিবাচক। তবে ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থায়নের গন্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত পরিবেশবান্ধব ও টেকসই প্রকল্পেই অর্থ যাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া অর্থনীতিবিদ ড. আবদুল বায়েস মন্তব্য করেছেন, কাগজে-কলমে প্রকল্পকে ‘সবুজ’ দেখিয়ে সহজ শর্তে ঋণ নেওয়া এবং তা অন্য কাজে ব্যবহারের সুযোগ থাকতে পারে। তাই ঋণ দেওয়ার আগে প্রকল্প যাচাই এবং বিতরণের পর অর্থের ব্যবহার নিয়মিত তদারকি করতে হবে।








