গুমের প্রস্তাবিত আইন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা গুমের প্রস্তাবিত আইন ও তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন। তারা বলেন, তদন্ত প্রক্রিয়া স্বাধীন না হলে তা বড় ধোঁকা হবে।
প্রকাশ: · ১ মিনিট পড়া

২০২৬ সালের ২৯ আগস্ট শনিবার ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এবং ব্লাস্টসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের উদ্যোগে এই সভার আয়োজন করা হয়। মূলত আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসটি ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে পালিত হলেও, এর আগেই ২৯ আগস্ট শনিবার এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে ব্লাস্টের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন। এছাড়া সভায় বিশিষ্ট আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান), ড. নাবিলা ইদ্রিস, ব্যারিস্টার শায়খ মাহদী, মো. নূর খান লিটন, ইজাজুল ইসলাম এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে নাসিমা বেগম ও মিজান জমাদ্দারসহ অনেকে অংশ নেন। সভায় প্রধানমন্ত্রী, ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, আবু সাঈদ ও মুগ্ধর প্রসঙ্গ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, রাজাপুর থানা, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও আইসিসি-র বিষয়গুলোও বিভিন্ন বক্তার বক্তব্যে উঠে আসে।
সভায় বক্তারা সম্প্রতি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। এই প্রস্তাবিত আইনগুলো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বক্তারা বলেন, গুমের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার ও তদন্ত প্রক্রিয়া যদি সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ করা না হয়, তবে তা দেশের মানুষের সঙ্গে এক ধরনের বড় ধোঁকা হিসেবে প্রমাণিত হবে। এ সময় তদন্তের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে ব্লাস্টের প্রতিনিধি ব্যারিস্টার সারা হোসেন তার বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তদন্তের প্রক্রিয়া স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করা না হলে তা হবে ‘এক ধরনের বড় ধোঁকা’। তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে গুমের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং শঙ্কার দিকটি অত্যন্ত জোরালোভাবে ফুটে ওঠে। বক্তারা মনে করেন, প্রস্তাবিত আইনে অনেক ফাঁকফোকর রয়ে গেছে যা ভুক্তভোগীদের প্রকৃত ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
বিশিষ্ট আলোকচিত্রী শহিদুল আলম সভায় বর্তমান বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পরও ভুক্তভোগীদের কথা শুনলে মনে হয় না দেশে কোনো প্রকৃত পরিবর্তন এসেছে। রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও গুমের শিকার পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের কষ্ট, যন্ত্রণা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার আকুতিতে এখনও কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের আকুতি সভায় উপস্থিত সবাইকে নাড়া দেয়। ষোল বছর আগে নিখোঁজ হওয়া ঠিকাদার মিজান জমাদ্দারের স্ত্রী নাসিমা বেগম অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ষোল বছর আগে আমার স্বামী ঠিকাদার মিজান জমাদ্দারকে গুম করা হয়েছে। এখনও বিচার পাই নাই। বিচার নিয়ে নানা রকমের ধান্দাবাজি ও বাণিজ্য হচ্ছে। তার এই বক্তব্যে গুমের বিচার প্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিচার প্রক্রিয়াকে ঘিরে চলা নানা অনিয়মের চিত্র অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে প্রকাশ পায়।
অনুষ্ঠানে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য তুলে ধরে জানানো হয় যে, ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে অন্তত সাতশ মানুষকে গুম করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক গুমের ঘটনার সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান মানবাধিকার কর্মীরা। বক্তারা বলেন, গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা না গেলে সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।








